Wednesday, December 23, 2015

ব্রিটিশ দম্পতি প্রমান করলেন তারা পেয়েছেন ভূতের দেখা! - See more at

 ব্রিটেনের অন্যতম বিখ্যাত দুর্গ 'ডুডল ক্যাসেল'। ডিন হার্পার ও তাঁর স্ত্রী অ্যামি হার্পার সেই ক্যাসেলে ঘুরতে গিয়েছিলেন। ক্যাসেলের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মোবাইলের মাধ্যমে প্রচুর ছবি তুলছিলেন। কিন্তু অবাক হলেন, যখন তোলা ছবিগুলো দেখতে লাগলেন। একটা ছবিতে বেশ দেখা যাচ্ছে দাঁড়িয়ে আছে ভূত!
এক্সপ্রেস.কো.ইউকে-এ প্রকাশিত একটি খবর থেকে জানা যায় এই খবর। ঐ দম্পতির দাবি তারা ভূত দেখেছেন।
উল্লেখ্য, ১০৭১ সাল থেকে ডুডলে ক্যাসেল হন্টেড হিসাবে পরিচিত। হার্পার দম্পতির বিশ্বাস ছবিটা ভৌতিক কোনও কিছুর অস্তিত্ব প্রমাণ করছে। ৩০ অগাস্ট এই ছবিটি তুলেছিলেন অ্যামি হার্পার।
ফটো ক্রেডিটঃ কেটারস, এক্সপ্রেস.কো.ইউকে

Tuesday, December 22, 2015

আসুন একটি সত্যিকার ভৌতিক ঘটনা জানি, অন্যান্য।

আমার জীবনে ঘটে যাওয়া প্রথম সত্যিকার ভৌতিক ঘটনা।

ভৌতিক ঘটনা
ভূত





আজ আমি আপনাদের আমার জীবনে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ভৌতিক ঘটনার মধ্যে একটি ঘটনা বলতে যাচ্ছি। আশা করি ভালো লাগবে।

যাই হোক এখন শুরু করা যাক, ২০১১ সালের কথা আমার গ্রামের বাড়ি ফেনীতে আমি আমার ফুফাতো ভাইয়ের মেঝো ছেলের আকীকার দাওয়াত পাই। দাওয়াতটিতে যাওটা অকেটা বাধ্যতামূলক ছিল

আর তাই নানা ঝামেলা থাকা সত্ত্বেও যেতে হয় সেই দাওয়াতে। বাড়ির অনুষ্ঠানে যা হয় গরু ছাগল এনে একাকার যেহেতু অনুষ্ঠানটি আকিকার। 

আমি ঢাকা হতে যেতে প্রায় বিকাল হয়ে যাই আর এই কারণেই হয়তো শরীর একটু কাহিল ছিল। বাড়িতে যেতে যেতেই বিকাল হয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। নানা

ফরমালিটিস পালন করতে করতে রাত হয়ে যায় আর ভোর রাতের দিকে বাবুর্চি, কসাই আসবে বলে আগে আগেই রাতে ঘুমিয়ে পরি আর একটু পরেই ঘটে যায় আমার জীবনের প্রথম ভৌতিক ঘটনা । 

ঘুমাতে ঘুমাতে হঠাৎ অনুভব করলাম কে যেন আমার পা টানছে আর আমাকে ডাকছে।  ঘুমন্ত অবস্থায় টের পাচ্ছিলাম যে আমাকে ডাকছে সে আর কেউ না আমার ফুফাতো ভাই-ই হবে আর যখন আমি আমার দুই চোখ খুললাম আমার অনুমানটি আর ভুল হলো না দেখি আমার ভাই সে আমাকে ইশারা দিয়ে বললো "আয় সময় হয়ে গিয়েছে আমি বাহিরে আছি তুই আয়"। আমি আর অপেক্ষা না করে মোবাইলে সময়টা দেখি তখন সময় হবে আনুমানিক রাত ৩.৩০টা, ঘুম থেকে উঠে বাহিরে যাবো এমন সময় আমার ফুফু বলে উঠলো "কিরে কোথায় যাস" আমি বললাম "ভাইয়া ডাকছে বাহিরে যাব" আমার এই কথা শুনে ফুফু একটু যেন অভাক দৃষ্টিতেই তাকালো আমি কিছু বলার আগেই দেখি অন্য রুম হতে আমার আরেক ফুফাতো ভাই বের হয়ে আসলো এবং আমাকে বললো আয় বাহিরে বের হই। আমি তখনও জানি না ব্যাপারটা কি, আমি যখনি বাহিরে বের হয়েছি তখনই টের পেলাম বাহিরটা একদম অন্ধকার এবং চারপাশ একদম নিশ্চুপ আমি ঠিক তখনিই ভাইকে বললাম ভাইয়া এখন কয়টা বাজে আর উনি তার মোবাইলে আমাকে সময় দেখালো সময় দেখে আমি নিজেকে মোটেও বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না যে, একটু আগে আমি মোবাইলে কি দেখলাম আর এখন কি দেখছি এখন বাজে রাত ১.০০ কিন্তু আমার একদম স্পষ্ট মনে আছে আমি মোবাইলে দেখেছিলাম তখন ছিলো রাত ২.৩০। এই সমীকরণ আমি কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না। 

আপনারা হয়তো মনে করবেন আমার ঘটনাটি এখানেই শেষ মোটেও না আমার মাথা আরও ঘুরিয়ে গেলো যখন আমার বড় ফুফুতো ভাইকে বললাম ভাইয়া "শিপন ভাই কোথায় উনে আমাকে না ডাকলো ডেকে কোথায় গেলো" আমার বড় ভাই শুনে বললো কিরে তুর কি হয়েছে তোকে না রাতে শিপন বললো ও রাতে একটু বাজারে যাবে আসতে আসতে রাত হবে আমার ঠিক তখনি মনে  পরলো আমি যখন ঘুমাতে যাই শিপন ভাই-এর সাথে কথা হয় যে উনি রাতে বাড়িতে থাকবে না গ্রামে কার জানি একটি বিচার হবে তাকে সেখানে থাকতে হবে। এতেও আমার মন কেমন যেন করছিলো তাই আমি সাথে সাথে শিপন ভাইকে ফোন দেই এবং বলি উনি কোনো সময় বাসায় এসেছিল কিনা আর উত্তরে শুনি উনি আসেননি তাহলে ঐ লোকটি কে ছিল যে আমাকে ডেকেছিল না সেটা একান্তই আমার মনের ভুল ছিল ও আরেকটি কথা যে কক্ষে আমি ঘুমিয়েছিলাম সেটি ছিল আমার ফুফার কক্ষ যে ২০০৯ সালে পরলোক গমন করেন আর ওনি খুবই খুবই আল্লহভীরু ছিলেন এবং এমন কোন রাত যেত না যে উনি তাহাজ্জদের নামায পড়তেন না। আর ঘটনাটি যখন জানাজানি হয় তখন বাড়ির মুরিব্বিরা বলছিলেন যে এটি যা ছিল ভালোই ছিল  কারন সেটি হয়তো চাচ্ছিলো আমাকে জাগিয়ে নামায পড়ানোর জন্য যেহেতু আমি প্রতিদিনই কমবেশি চেষ্টা করি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পোড়তে।

আমি আজও যখন ঘুমাতে যাই আমার সেই আনুভূতিটার কথা মনে পড়ে আর প্রচন্ড ভয় লাগে। আসলে এসব ঘটনা হলো এমন ধরনের ঘটনা যে প্রত্যক্ষ করেনি সে কখনিই বলতে পারবে না যে সেটা কতটা লোমহর্ষক। আজকের মতো আমার ঘটনাকে এখানেই ইতি টানছি বলার মতো আরও অনেক ঘটনা আছে যদি জানতে চান তাহলে পোস্টির নিচে কমেন্টের মাধ্যমে জানিয়ে দিবেন, ধন্যবাদ।

আশা করি পোস্ট পড়ে কিছুটা হলেও ভয় লেগেছে।

জিনকে গাছ থেকে নামাতে নাস্তানাবুদ সেনা, পুলিশ ও দমকল বাহিনী!

 রাত হলেই সাভারের মায়েরা নাকি তাদের বাচ্চাদের সেই জিনের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। অবশেষে সেই জিন গাছ থেকে নেমে এসেছে। তবে সময় গেছে সারারাত। আর নাস্তানাবুদ হয়ে গেছেন সেনাবাহিনী, পুলিশ ও দমকল বাহিনীর সদস্যরা। জিন পরিচয়ে এক নারী এতদিন ঘুরে বেরিয়েছেন গাছে গাছে। এমনকি সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা ভেঙ্গে সবার অগোচরে বাস করে আসছিলেন সামরিক খামারের একটি গাছে। কেরামত আলী নামের একজন ঐ গাছে নিচ দিয়ে যাবার সময় ঘটে ঘটনার সূত্রপাত।
ঘটনাটি ঘটেছে সাভারে। এ যেন এক ভৌতিক কাহিনী। গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে সাভারের সামরিক খামারের একটি গাছের নিচ দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করার সময় গাছের ওপর থেকে নারীকণ্ঠ শুনেই চমকে যান কেরামত আলী। তিনি বলেন, গল্পে অনেক ভূত-প্রেতের কথা শুনেছি। মনে হচ্ছিল বাস্তবে আমিও ভূতের পাল্লায় পড়েছি।
কেরামত আলী বলেন, মনে মনে আমি আল্লাহকে ডাকতে থাকি, আর জোর কদমে পা চালাই। যতই পায়ের জোর বাড়ে ততই যেন কাছে আসে নারীর কণ্ঠস্বর। ভাবছি এই বুঝি আমাকে ধরে ফেলল। দৌড়ে কোনোমতে রেডিও কলোনির কাছাকাছি পৌঁছে বিষয়টি নিকটজনদের জানাই। এরপর এ-কান ও-কান হয়ে প্রশাসন পর্যন্ত গড়ায়। জিন-মানবী নিয়ে এমনই লোমহর্ষক কাহিনী উঠে এসেছে নয়াদিগন্ত-র একটি রিপোর্টে।
কেরামত আলী বলেন, পরে আরেক পথচারীর একই অভিজ্ঞতার খবর শুনে প্রথমে পুলিশ, পরে দমকল বাহিনীকে খবর দেন। পরে সেনাসদস্যরাও যান ঘটনাস্থলে। টর্চের আলোতে দেখেন এক নারী বসে আছেন গাছের মগডালে। আর তাকে নিচে নামিয়ে আনতে শুরু হয় প্রশাসনের তৎপরতা।

সেনা, পুলিশ ও দমকল বাহিনীর লাগাতার চেষ্টা এবং ঘাড় মটকানোর হুমকি

সাভার মডেল থানার ওসি মোস্তফা কামাল সাংবাদিকদের জানান, গেছো-মানবীর খবর পেয়ে রাত ৯টায় ঘটনাস্থলে পুলিশ নিয়ে যাই আমরা। তাকে গাছ থেকে নামানোর চেষ্টা করলে তিনি ঘাড় মটকে দেবেন বলে হুমকি দেন। তাকে ধরতে গেলে তিনি গাছ থেকে লাফিয়ে মরে যাবেন এরকম ভয় দেখাতে থাকেন। হাজার হোক একজন নারী। এই অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আমরা তাকে উদ্ধারের জন্য খবর দেই ফায়ার ব্রিগেডে। সাইরেন বাজিয়ে তারা আসতে না আসতেই সেখানে চলে আসেন ঊর্ধ্বতন সেনাকর্মকর্তারা। স্থানটি সেনানিবাস এলাকা হওয়ায় বিব্রত হন সেনাসদস্যরা। কীভাবে ওই নারী নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে সেনানিবাস এলাকায় প্রবেশ করে একটি গাছে রাতযাপন করেন, সে ব্যাপারে অনুসন্ধান শুরু করেন তারা। এতে দায়িত্ব পালনে নিরাপত্তাকর্মীদের কারো গাফিলতি থাকলে তার ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেনাকর্মকর্তা।

ভূত পরিচয় থেকে রক্ষা

শুধু কি এই জিনের শিকার কেরামত আলী? না। অনেকেই পড়েছেন এই জিনের পাল্লায়। কেউ জানতই না তিনি জিন না, একজন মানুষ। মঞ্জিল হোসেন নামের একজন যখন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তখন সবার ভুল ভাঙ্গে। তিনি রক্ষা পান জিন পরিচয় থেকে।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে মঞ্জিল হোসেন বলেন, গাছ থেকে ভূত নামানোর খবর শুনেই আমি ছুটে যাই সামরিক খামারে। আমার মায়ের নাম আমেনা (৪৫)। সময় হলে তিনি নিজের ইচ্ছায় গাছ থেকে নেমে আসবেন।

দারিদ্র্যর কারণে মাকে জিন হিসেবে মেনে নেয়া

মঞ্জিল হোসেন বলেন, আমরা জানতাম মা দীর্ঘদিন ধরেই রাতে গাছে বসবাস করেন। তবে চক্ষুলজ্জায় বিষয়টি আমরা কাউকে প্রকাশ করিনি এত দিন। প্রায় দিনই গাছে রাতযাপন করছেন আমার মা। এক বেলায় গাছে উঠলে পরের বেলায় নির্দিষ্ট সময়ে নেমে আসেন তিনি। আমরা প্রথম প্রথম খোঁজ নিতাম। গাছে গাছে টর্চ লাগিয়ে মাকে খুঁজতাম। এখন বিষয়টি গা সওয়া হয়ে গেছে। তিনি আরো জানান, অনেকে বলেছে এটা নাকি মানসিক ব্যাধি। আধুনিক চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। কবিরাজের শরণাপন্ন হয়েছি, তাবিজ-কবজ দিয়েছি। কিন্তু তিনি এখনো জিনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের আধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানান, এ ধরনের রোগী সাধারণত সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। তারা মানসিক বিভ্রাট ও হ্যালোসিনেশনে ভোগে।
আমেনার মেয়ে রুবিনা বেগম বলেন, বিকেল ৩টা নাগাদ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন মা। একপর্যায়ে আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়েই উধাও হয়ে যান মা। পরে রাতে আবিষ্কার করি গাছের মগডালে রয়েছেন তিনি।
রাতে টহলে থাকা এক পুলিশ সদস্য জানান, সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে আমরা নিজেরা একপর্যায়ে পদক্ষেপ নেই ওই নারীকে গাছ থেকে নামিয়ে আনতে। একজন গাছে ওঠা মাত্রই প্রচণ্ড শক্তিতে তিনি গাছে ঝাঁকুনি দিতে থাকেন। শেষে ভোরে উপস্থিত অনেকের চোখকে কপালে তুলে শান্ত আর স্বাভাবিকভাবে গাছ থেকে নেমে আসেন গেছো-মানবী। এর পর ছেলে আর মেয়ের হাত ধরেই বাড়ির পথে হাঁটা দেন তিনি।

দিল্লির রাস্তায় দেখা মিলল ভূতের! (ভিডিও)

(প্রিয়.কম) মাঝরাতে দিল্লির রাস্তায় সাদা শাড়ি পরা এক মহিলাকে ধীর গতিতে হেঁটে যেতে দেখা গেল। কিন্তু অদ্ভূত বিষয় খানিকক্ষণ বাদেই তিনি উধাও। আবার হয়ত রাস্তার অন্য ধারে হঠাৎই দেখা মিলল তার। রাস্তার সকলেই তাকে দেখে দূরে পালিয়ে যাচ্ছেন। বা উন্মাদের মত উল্টো দিকে ছুটতে শুরু করছেন। তবে কি তিনি ভূত!
সম্প্রতি এমনই এক ভিডিও সোশ্যাল সাইটে ভাইরাল হয়েছে। এই ভিডিওতে দেখা গিয়েছে মহিলা এক অটোচালকের কাছে পৌঁছতেই সে ছিটকে অটো থেকে বেড়িয়ে দৌড়তে শুরু করেছে। রাস্তার ধারে অনেক গাড়িও মহিলাকে দেখে থমকে গেলেও আবার স্টিয়ারিং ঘুড়িয়ে দে-দৌড়। রাস্তার অনেক লোকই মহিলাকে দূর থেকে দেখেছেন কিন্তু তার কাছে যাওয়ার সাহস কারও হয়নি।
সোশ্যাল সাইটে রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এই ভিডিও। কিন্তু এটি কোনও ভূতের গল্প আদতে নয়। এটি নিছক একটি মজা। আপনিও একবার ভিডিওটি দেখেই নিন।
তথ্যসূত্র: কলকাতা২৪
টপিক: 
ঘটনার স্থান: 

Saturday, December 12, 2015

সিংহাসন

আজ আপনাকে এক অদ্ভুত গল্প শোনাবো। যদি ও জানি আপনি এর এক দন্ড ও বিশ্বাস করবেন না। ভাববেন আমি পাগল কিনবা বদ্ধ উন্মাদ। কিনবা মানসিক হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসা কেউ। কিন্তু বিশ্বাস করেন আমি আজ যে কথা গুলো বলবো তাতে বিন্দু মাত্র মিথ্যা লুকানো নেই। আমি লেখক হতে পারি, বানিয়ে বানিয়ে প্রচুর গল্প লিখতে পারি - কিন্তু আমি আজ যে জিনিসটা নিয়ে আপনাদের কাছে লিখছি সেটা আমার সামনেই আছে। একটা সামান্য সিংহাসন মাত্র এটা। আমি এটাতে বসেই লিখছি আপনার কাছে। আমি এটা সম্পর্কে যা যা লিখবো সব সত্য লিখবো এটা প্রতিজ্ঞা করেই শুরু করলাম। ঘটনার শুরু যখন আমি মেসে থাকি- ঢাকায় এক অভিজাত এলাকায়।বাবার অনেক টাকা থাকায় আমোদ ফুর্তিতে আমি ছিলাম একেবারেই মত্ত। আমি পড়তাম এক অভিজাত প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি তে। সারাদিন আড্ডা- নেশা করা- বিভিন্ন যায়গায় হটাত করে চলে যাওয়া ছিল আমার নিত্য দিনের অভ্যাস। আমি কুমিল্লার ধর্ম সাগরে নেশা করে নৈকায় ঘুরেছি- সমুদ্রে চাঁদের আলোর নিচে বসে বসে বন্ধুদের মাঝে বিলিয়েছি ঘুমের মন্ত্র। নীল পাহাড়ে গিয়েছি একদম ঠান্ডার মাঝে। এসব করে অভিজ্ঞতা ও আমার কম হয়নি। আমি সেই অভিজ্ঞতা গুলো জমিয়েই লিখেছি ১০ টা উপন্যাস। সব গুলোই বই আকারে আছে। আপনারা হয়ত "নীলাভ তারার কালচে আলো" উপন্যাস টা পড়েছেন। এইত কদিন আগে ঈদে এটা থেকে নাটক হয়ে গেল। জাহিদ হাসান আর জয়িতা অভিনয় করেছিল। যাই হোক সেই এক সময় আমি গিয়েছিলাম সুন্দর বন। সময়টা বেশিদিন আগের না। মাত্র তিন মাস আগে। প্রথমে গিয়েছিলাম খুলনা- সেখান থেকে বরগুনা ঘুরে সুন্দরবন । একসপ্তাহ ছিলাম আমি সেখানে- সাথে ছিল আমার তিন মেস মেট। আমরা একসাথেই পড়ি। লেখা পড়া শেষ হবার উপলক্ষে আমাদের এই ট্যুরের স্পন্সর আমি। ফেরার আগেই ছয়দিন আমরা অনেক অনেক আনন্দ করেছি। টাকা খাইয়ে এক বনবিভাগের লোক কে আমরা ঢুকে ছিলাম চিত্রা হরিণ শিকার করতে। আমি নিজেই একটা মেরেছি। সেটার মাংস পুড়িয়ে খেয়েছি নদীর পাড়ে। আমি যেখানেই যাই অঢেল টাকা নিয়ে যাই। সেবার ও নিয়েছিলাম অনেক টাকা। ইচ্ছা ছিল সব ঊড়িয়ে খালি হাতে দেশে ফিরব। কিন্তু হলনা। সুন্দরবন থেকে ফেরার পথে আমরা খোঁজ পেলাম একটা বজরার। এটা এক সৌখিন মানুষ সুজন মোল্লার। উনার বজরা তে আমরা ঊঠেছিলাম শুধু মাত্র নৌকা ভ্রমণের জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়েই আমরা জানতে পারি এই বজরা ছিল কুখ্যাত ডাকাত করিম মোল্লার। এবং এই সুজন মোল্লা তার ই সন্তান। শুনে তো আমরা অনেক ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু আমাদের সুজন মোল্লা অভয় দেয়। সে এখন ডাকাতি করেনা। তার বাবার রেখে যাওয়া অঢেল টাকা আছে। সে কোন কাজ করেনা- পায়ের উপর পা তুলে খায়। এভাবে কথায় কথায় আমাদের সাথে সুজন মোল্লার বেশ ভাব হয়। আমরা সেইদিন রাতে বজরায় একসাথে জোছনা দেখলাম। পরদিন আমাদের তিনজন কে সুজন মোল্লা কিছু অদ্ভুত জিনিস দেখালো। সেগুলো ছিল তার ই বাবার রেখে যাওয়া ডাকাতির মাল পত্র। এর মাঝে একটা সিংহাসন দেখলাম আমি। দেখেই আমার খুব ভাল লেগে গেল। আমি এটার কাহিনী জানতে চাইলেই উনি বললেন আজ থেকে প্রায় বছর পঞ্চাশ আগে একবার ডাকাতি করতে গিয়ে আরেক ডাকাত এর সাথে লড়াই করে এই সিংহাসন কেড়ে নেন করিম মোল্লা। সেই ডাকাত- যে এই সিংহাসন এর মালিক ছিল - সে এটা পেয়েছিল তার বাবার কাছ থেকে। তার বাবা ছিল ব্রিটিশ আমলের কুখ্যাত ডাকাত নিরঞ্জন পালী। তিনি এটা নিয়ে এসেছিলেন উত্তর বাংলার জমিদার জ্ঞানদা চরণ মজুমদার এর সভাকক্ষ থেকে। নিরঞ্জন পালী বেশ হিংস্র ছিলেন। তিনি যখন এই সিংহাসন কেড়ে নিতে যান তখন এটাতেই বসা ছিলেন জ্ঞানদা চরণ। একটা তলোয়ার জ্ঞানদা চরণের পেটে আমুল বসিয়ে লাশ সহ সিংহাসন নিয়ে আসেন তার আস্তানায়। সেখান থেকে হাত ঘুরে এই বজরায়। এটা পাওয়ার পর প্রায় ১৫০ বছর অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু এখন ও সিংহাসনটার অদ্ভুত জেল্লা দেখে আমি অবাক হলাম।সিংহাসন এর উচ্চতা আনুমানিক চার ফুট। সবার উপরে একটা ময়ুরের মাথা আর পালক। সেই পালকে গাথা শ'খানেক মুক্তা আর নীলা। দুই হাতলে আছে অদ্ভুত সিংহ খচিত কারুকাজ। হাতলের শেষে সিংহের মুখ হা করে আছে। আর চোখ দুটো তে উজ্জ্বল পাথর। পিঠের নিচে আছে মখমলের নরম আবরন। পায়া চারটার মাঝে জ্বল জ্বল করছে সাতটা করে নীলা। কালচে রং এর কাঠের আবরনে এখন ও কেমন যেন রাজা মহারাজা আবেশ ছড়িয়ে আছে। আমি অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে ছিলাম সিংহাসনটার দিকে। আসলে এই রকম একটা জিনিস এই ভাঙ্গা বজরাতে থাকতে পারে সেটা নিজের চোখেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। যাদুঘরে রাখার মত এই সম্পদ এই আস্তাকুড়ে নৌকায় পড়ে আছে ভাবতেই মনটাই খারাপ হয়ে গেল। আমার সাথে এক লাখের মত টাকা ছিল। আমি সুজন মোল্লা কে তখন ই সিংহাসনটা কেনার জন্য আবদার করলাম। সুজন মোল্লা ও না করেনি। আমাদের কে জিনিস গুলো দেখানো মানেই ছিল এগুলো আমাদের কাছে বিক্রি করে তার পেট চালানোর ধান্ধা। কিন্তু সে যা দাম চাইল তাতেই মাথায় হাত পড়ল আমার। সেই এই সিংহাসন এর দাম হাঁকল দশ লাখ টাকা। আমি ঊষ্ণা প্রকাশ করতেই সে একজন জহুরী ডাকাল। সেই জহুরী প্রতিটা পাথর আমাদের
সামনে পরীক্ষা করে জানাল প্রতিটি পাথর ই মহামুল্যবান। সব মিলিয়ে এই সিংহাসন এর দাম কম করে হলেও কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। আমি সেই দিনেই আব্বাকে ফোন করে টাকার ব্যাবস্থা করলাম। উনি সাথে দুইজন লোক ও পাঠিয়ে দিলেন। ঐ লোকগুলো সিংহাসনটাকে নিয়ে রওনা দেয় আমার মেসে এর উদ্দেশ্যে। আমি ঢাকায় পৌছানোর একদিন পরেই ঢাকায় পৌছায় আমার সিংহাসনটা। কিন্তু এটা আনার পরদিন ই এক অদ্ভুত কান্ড ঘটে। রাতে আমি একটা অ্যাসাইনমেন্ট এর কাজ এ দেরী করে ঘুমিয়ে ছিলাম। সকালে ঘুম থেকে ঊঠে দেখি সিংহাসন এর বসার যায়গায় মরে পড়ে আছে একটা বাচ্চা ইদুর। আমি কাজের বুয়া কে ইদুরটা সরাতে বলেই চলে গেলাম ভার্সিটি। যখন ঘরে ফিরি তখন সন্ধ্যা। আমি কলিং বেল অনেক বার টিপে ও কেউ খুলে না দিলে দাড়োয়ান ডেকে দরজা ভাঙ্গার ব্যাবস্থা করি। এবং দরজা ভেঙ্গে আমার রুমে গিয়ে যা দেখি তার জন্য আমি কোনদিন প্রস্তুত ছিলাম না। দেখলাম সিংহাসন এর উপর কাজের বুয়া অদ্ভুত ভাবে পড়ে আছে। নাক দিয়ে রক্তের একটা ধারা। আর কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। দেখে আমি হতভম্ভ। তাড়াতাড়ি হাসপাতাল নিয়ে যাই। সেখানে জানায় সে মারা গেছে অনেক ক্ষন আগে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারনে। ডাক্তার পুলিশ কেস করতে বলেছিল। আমি টাকা খাইয়ে ডাক্তার কে ম্যানেজ করি। টাকা খাইয়ে দাড়োয়ানের মুখ ও বন্ধ করি। এবং কাজের বুয়ার পরিবার কে দশহাজার টাকা দিয়ে চুপ থাকতে বলে ছেড়ে দেই সেই মেস। এবং সিংহাসনটাকে পাঠিয়ে দেই আমার গ্রামের বাড়িতে। সেখানে আব্বাই আমাকে সেটা পাঠিয়ে দিতে বলেন। এবং আমার দুর্ভাগ্যের শুরু সেখান থেকেই। দুই সপ্তাহ পর বাসা থেকে জরুরী ফোন আসল। বলা হল আমার খালা খুব অসুস্থ। আমি যেন চলে আসি। আমি তড়িঘড়ি করে গিয়ে দেখি খালা মারা গেছেন। আমি লাশের মুখ টা দেখতে চাইতেই দেখলাম খালার নাকের কাছে জমে থাকা লালচে রক্ত। বুঝতে বাকি থাকল না যে খালা সেই সিংহাসন এ বসেই মারা গেছেন। আমি সেইদিন ই জানাজার পর ফোন করলাম সুজন মোল্লা কে। সে আমাকে জানাল এই সিংহাসন অভিশপ্ত। কেউ এটাতে বসলেই সে একটা ঘোরের মাঝে চলে যায়। তারপর সে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে। সেই ঘুম কখনো ভাঙ্গে না। এতেই সুজন মোল্লার বাবা করিম মোল্লা মারা যান। এটাতেই মারা যায় সুজন মোল্লার মেয়ে জামাই।এই কথা আমাকে আগে কেন জানায় নি জানতে চাইতেই ঐ পাশ থেকে ফোন কেটে দেয় সুজন মোল্লা। বুঝলাম ডাকাতি না করলে ও স্বার্থের জন্য করেনা কিছু বাকি নেই তার। দশ লাখ টাকার জন্য মেরে ফেলেছে দুজন
মানুষ কে। আমি সেই দিন ই লুকিয়ে ফেললাম সিংহাসনটাকে। বাড়িটা বিশাল আমাদের। পুরোনো বাড়ি- অনেক গুলো রুম। আমি একটা স্টোর রুমে লুকিয়ে ফেললাম সেটাকে। কিন্তু থামাতে পারলাম না মৃত্যু। ঠিক দুইদিন পর খবর আসল আমার বড় ভাই মারা গেছেন। আমি গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখলাম ভাইয়ার ও একই অবস্থা। নাকের কাছে এক ফোঁটা রক্ত। বুঝলাম ভাইয়া কোন একটা কাজে সেই স্টোর রুমে গিয়েছিলেন। গিয়েই চেয়ারটা দেখে লোভ সামলাতে না পেরে বসে পড়ে। আর মারা যায়। আমি প্রায় উন্মাদ হয়ে গেলাম।ভাইয়ার মৃত্যু কে আমার আম্মা মেনে নিতে পারেন নি। তিনি পরদিন স্ট্রোক করে মারা যান। এবং একে একে আমাদের পরিবারের এগার জন এই সিংহাসন এ বসে বসে মারা গেলেন। আমি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কিছু ই করার ছিলনা। কারো কাছে বিক্রি ও করতে পারছিলাম না লুকিয়ে ও রাখতে পারলাম না। যেন একের পর এক মানুষ কে টেনে নিয়ে মারে ইচ্ছা মত সিংহাসনটা।আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে একটু আগে আমার আব্বাকে কবর দিয়ে এসে সিংহাসনটাতে বসেই লিখছি এই সব। বিশ্বাস করেন এর একবিন্দু ও মিথ্যা না। আমি যা যা লিখেছি তার সব সত্য। যেমন একটু আগে থেকে আমি একটা খুব সুন্দর মেয়েকে দেখতে পাচ্ছি। চমৎকার একটা শাড়ি পড়ে আছে। হাতে একটা থালা। তাতে নানা রকম ফল। আমি লেখার ফাঁকে ফাঁকে মেয়েটাকে দেখছিলাম। এখন মেয়েটা আস্তে আস্তে সামনে এসে আমাকে ফল খাওয়ালো। আমি ও খেলাম।কি ফল জানিনা। কোনদিন
খাইনি। কিন্তু আশ্চর্য স্বাদ। মেয়েটা এরপর থালাটা মাটিতে রেখে নাচ শুরু করল। আমি ঊঠে মেয়েটার সাথে নাচতে চাইলাম। কিন্তু আমাকে জোর করে বসিয়ে দিল আরো দুই জন হটাত করে উদয় হওয়া মেয়ে। তারপর আমাকে একজন একটা হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগল। আরেকজন একটা রুপার পাত্রে ঢেলে দিল মদ। আমি মদ খেয়ে মাতাল হতে শুরু করেছি। তাই লিখতে পারছিনা। হয়ত এটাই আমার জীবনের শেষ ক্ষন। কারন একটু আগেই নাকের কাছে একটা সরু রক্তের ধারা টের পেয়েছি। কিন্তু কিছুই করার নেই। আমি ঊঠতে পারছি না সিংহাসন ছেড়ে। মেয়েটার নাচের তাল বেড়েই চলল। কেউ একজন হাতের তালি দিয়ে তবলার বোল দিচ্ছে। মেয়েটা নেচে চলেছে। তা ধিন ধিন ধা তা ধিন ধিন ধা- না তিন তিন না- তেটে ধিন ধিন ধা- ধা- আহ মাথার চার পাশ কেমন যেন হালকা হয়ে আসছে। এখন সামনে শুধু মেয়েটা নাচছে। আর কিছু শুনতে পারছিনা। খুব ঘুম পাচ্ছে। প্রচন্ড ঘুম। আমি ঘুমালাম- জীবনের শেষ ঘুম। আপনি এই সিংহাসন টাকে ধবংস করে দেবেন। ভুলেও লোভে পড়ে এতে বসবেন না। বসলেই নিশ্চিত মৃত্যু ................ ইতি রাওসিভ হাসান.।.। দুই মাস পর বর্ষা যাদুঘরে এসেছে ওর মা বাবার সাথে।ওর খুব শখ পুরাত্ন জিনিস পত্র দেখার। তাই প্রতিমাসে সে আসে জাতীয় যাদুঘরে। দেশের প্রায় প্রতিটি যাদুঘরে ও ঘুরে ঘুরে সব মুখস্থ করে ফেলেছে। কিন্তু সে এখন তিন তলার ডান পাশের রুমে নতুন যে সিংহাসন টার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেটা সে আগের বার আসার সময় দেখেনি। তাই মন যোগ দিয়ে সিংহাসন এর সামনে লেখা বর্ণনা পড়তে লাগল। তাতে লেখা- " পশ্চিম বাংলার জমিদার জ্ঞানদা চরণ এর হারিয়ে যাওয়া সিংহাসন এটা। পাওয়া গেছে গাজিপুরের হাসান পরিবারে। সিংহাসনটা জ্ঞানদা চরণ নিজে বসার জন্য বানায় নি। সেটা বানিয়ে ছিলেন তার ভাই রুক্ষদা চরণের জন্য। এটা ছিল একটা মরন ফাঁদ। এই সিংহাসন এর সব খানেই মেশানো আছে একধরনের অজানা বিষ। এই সিংহাসন এ বসলেই এই বিষ প্রবেশ করে বসা ব্যাক্তির উপর। তারপর আস্তে আস্তে ঐ ব্যাক্তির মৃত্যু হয়। জ্ঞানদা চরণ তার ভাইকে মারার জন্য এটা বানালে ও কুখ্যাত ডাকাত নিরঞ্জন পালী এটাকে হস্তগত করে। এর পর প্রায় ২০০ বছর এটার অস্তিত্ব অজানা ছিল। একমাস আগে হাসান ফ্যামিলির রাওসিব হাসানের মৃতদেহ আবিষ্কারের মাধ্যমে এটা ঊঠে আসে সভ্যতার সামনে। নিরীহ দর্শন এই সিংহাসন হত্যা করেছে প্রায় ৪০ জনের মত নিরীহ মানুষ কে। তাই এটা থেকে দূরে থাকুন ................ লেখাটা পড়েই বর্ষা খুব ভয় পেল। তারপর দৌড়ে চলে গেল ওর বাবার কাছে ...........

তাহলে কে এসেছিল

সকাল বেলা। বাজার থেকে ফিরে গোছল সেরে খেয়ে দেয়ে অফিস যাবার জন্য তৈরি হয়েছি । নীচের গেটে শব্দ। মা বলল, দ্যাখ তো বাদল, কে এল। সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলাম। একতলায় অ্যাডভোকেট নাজমূল করিম ভাড়া থাকেন। সাধারণত কেউ এলে ওদেরই কেউ একতলার গেট খুলে দেয়। নাজমূল করিম সাহেব গতকাল পরিবার নিয়ে দেশের বাড়ি বেড়াতে গেছেন। আগামীকাল ফেরার কথা। পিকলুকে মিস করছি। পিকলু নাজমূল করিম সাহেবের ছেলে। ক্লাস সেভেনে পড়লেও পিকলু সঙ্গে আমার বেশ ভাব। পিকলুকে ঘুড়ি ওড়ানোর কলাকৌশল শেয়ার করতে করতে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। টিনের গেটটা খুললাম। কাপড়ের বোচকা হাতে একজন বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে। পরনে কালো পাড় সাদা শাড়ি। ঘোমটার নীচে মুখটি বেশ ফরসা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মুখেচোখে এককালে শ্রী থাকলেও এখন কুঁচকে গেছে। কপালে পাকা চুলও চোখে পড়ল। বৃদ্ধাকে আমি এর আগে কখনও দেখিনি। বললাম, কাকে চান? বৃদ্ধা খনখনে কন্ঠে বলল, এইটা তৈয়বের বাড়ি না? তৈয়ব মানে, তৈয়বুর রহমান? হ। হ্যাঁ। তৈয়বুর রহমান আমার বাবা। আপনি ভিতরে আসুন। না, তুমি আগে তৈয়বরে ডাকো। আমি কি বলতে যাব। থমকে গেলাম। আমার বাবা গতবছর মারা গেছে। বৃদ্ধা বাবাকে চেনে অথচ বাবা যে গত বছর মারা গেছে তা জানে না। বললাম, মানে ... বাবা তো মারা গেছে। মারা গেছে? কবে? বৃদ্ধা তীক্ষ্মকন্ঠে জিগ্যেস করে। গত বছর।বললাম। হায় আল্লা, কও কি ... আমারে কেউ খবর দিল না। বৃদ্ধা আর্তনাদ করে উঠল। ততক্ষণে মা দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। বলল, কে রে বাদল? আমি চিনি না মা। মুখ ফিরিয়ে বললাম। মরিয়ম বু না? বলে মা চেঁচিয়ে বলল। হ, আমি মরিয়ম। বৃদ্ধা মাথা নেড়ে বলে। দাঁড়াও। আমি আসছি। একতলার সিমেন্টের উঠানটি রাস্তা থেকে বেশ কিছুটা উঁচু। বললাম, আপনি ভিতরে আসেন। বলে বৃদ্ধার হাত ধরলাম। ধরেই চমকে উঠলাম। বৃদ্ধার হাত ভীষণ ঠান্ডা। আর ভেজা। যেন মরা মাছ ছুঁয়েছি। মা নীচে নেমে এল। বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে বলল, কত বছর পর তোমারে দেখলাম মরিয়ম বু। আমাগো একদম ভুইলা গেছ। বলে আমার দিকে তাকিয়ে মা বলল, মরিয়ম বু তোর আব্বার ফুপাত বোন। জগদীশপুর থাকে। ও। আমি ঘড়ি দেখি। অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। বললাম, মা, আমি গেলাম। মা বলল, আচ্ছা, তুই যা। চল, বুবু, ওপরে চল। তেমারে কতদিন পর দেখলাম । সেই বিয়ে পর একবার দেখছিলাম। গলিতে নেমে এসে একটা সিগারেট ধরালাম। বেশ ঝকঝকে রোদ উঠেছে। সকালের দিকে অবশ্য মেঘলা ছিল। আমার অফিস কাছেই। আমার ভাগ্য ভালো। এইচএসসি-র পর ঢাকা শহরে পড়াশোনা করলেও নিজের মফঃস্বল শহরেই একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে গেছি। বাবা গত বছর মারা যাওয়ার পর ছোট্ট সংসারে আমি আর মা। আমার অবশ্য বড় এক বোন আছে। শাপলা আপার বিয়ে হয়ে গেছে। শ্বশুরবাড়ি রূপপুর। ফাঁকা শূন্য ঘরে আমার মায়ের ভালো লাগে না। মা আমার জন্য পাত্রী দেখছে। আমার চাকরির পর মা আমার বিয়ের ব্যাপারে সিরিয়াস হয়েছে। পাত্রী অবশ্য একরকম ঠিক। নাদিরা। এ শহরেরই মেয়ে। শাপলা আপার বান্ধবী শিখা আপার ছোট বোন। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে স্থানীয় একটি মহিলা কলেজে বি . এ পড়ছে নাদিরা। প্রায়ই আমাদের বাড়ি আসে। মায়ের সঙ্গে খুব ভাব নাদিরার। নাদিরাকে সঙ্গে নিয়েই মা বিয়ের শাড়ি কিনছে। নাদিরার বড় মামা কুয়েত থাকেন। মাস খানেক পর তিনি দেশে ফিরবেন। তখন বিয়ে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পথে মরিয়ম ফুপুর কথা মনে হল। অফিস থেকে হাঁটতে- হাঁটতে বাজারে গেলাম। এলোমেলো ঘুরলাম কিছুক্ষণ। কি কিনব বুঝতে পারছি না। সকালে বাজারে এসে বড় একটা রুইমাছ কিনেছি। তরিতরকারিও আছে ঘরে। বেছে- বেছে দরদাম করে এক ডজন কমলা কিনলাম । হঠাৎ মনে পড়ল। মা কালরাতে সুপারি কিনতে বলেছিল। সুপারি কিনে বাজারের বাইরে এসেছি। ঠিকই তখনই মনিরুল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। মনিরুল ভাই সেতারা ফুপুর ছেলে। সেতারা ফুপু আমার বাবার খালাতো বোন। সেতারা ফুপুরা তালতলা থাকে। অনেক দিন দেখা সাক্ষাৎ নাই। মনিরুল ভাইয়ের সঙ্গেও অনেক দিন পরে দেখা। মনিরুল ভাই পোলট্রির বিজনেস করেন। বললেন, মা খুব অসুস্থ। শুনে আমার মন খারাপ হল। বললাম, আজকালের মধ্যেই মাকে নিয়ে তালতলা যাব। মনিরুল ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গলিতে হাঁটছি। লোড শেডিং চলছিল বলে গলি অন্ধকার। সেতারা ফুপু অসুস্থ শুনে খারাপ লাগছিল। আজকাল সেতারা ফুপুদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ কমে গেলেও এককালে যোগাযোগ ছিল। ছেলেবেলায় সেতারা ফুপু আমাকে আদর করতেন । ঘুড়ি কেনার পয়সা দিতেন । বাড়ির সামনে আসতেই কারেন্ট এল। দরজা খুলল মা। বললাম, বাজারে মনিরুল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। কি কইল মনিরুলে? ওর মায়ে কেমন আছে? বললাম, সেতারা ফুপু অসুস্থ। শুনে মা অস্থির হয়ে উঠল। বলল, তুই কালই আমারে তালতলা নিয়া চল। বললাম, আচ্ছা, তোমাকে কালই তালতলা নিয়ে যাব। ঘরে ঢুকে রান্নার চমৎকার গন্ধ পেলাম। রান্নাঘরে এলাম। মরিয়ম ফুপু চুলার সামনে বসে । হাতে কমলার
ঠোঙা দিতেই ফুপুর আঙুলের স্পর্শে চমকে উঠলাম। হাত কেমন ঠান্ডা। যেন মরা মাছ ছুঁয়েছি। মরিয়ম ফুপু অদ্ভুত শব্দ করে হেসে উঠল। চশমার কাঁচের ওপাশে চোখ দুটি যদিও নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছি। আমার শরীর শিরশির করে উঠল। রাতে খেতে বসে অবাক হলাম। মুগের ডালের খিচুরি আর ধনে পাতা দিয়ে রুই মাছ। চমৎকার রান্না। মা বলল, তোর মরিয়ম ফুপুর রাঁধছে । তোর আব্বায় মুগের ডালের খিচুরি আর ধনে পাতা দিয়ে রুই মাছ পছন্দ করত। ওহ্ । রাতে ঘুম এল না। বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে একবার নাদিরা মিস কল দিয়েছিল। তখন মোবাইলে নাদিরার সঙ্গে বেশ খাণিক ক্ষণ উষ্ণ প্রেম হল। মোবাইলের কল্যাণে এখন এসব মফঃস্বল শহরেও পৌঁছে গেছে। তারপর ক্লান্ত হয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম ভাঙার পর মনে হল ঘরে আমি একা নই। আরও কেউ আছে। যে আছে সে অন্ধকারে ঘরে হাঁটছে। ঘর অবশ্য একেবারে অন্ধকার নয়। জানলা গলে চাঁদের সাদা আলো ঢুকেছে ঘরে। খুট করে শব্দ হল। মনে হল কেউ কিছু খুঁজছে। বেশ ভয় পেলাম। আমার শরীর ঘামে ভিজে গেছে । সাহস করে উঠে বসলাম। তারপর আলো জ্বালালাম। নাঃ, ঘরে কেউ নেই। আবার আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম । তার আগে ঘড়ি দেখলাম। রাত দেড়ট বাজে। জানালায় অস্থির বাতাস। আর জোছনার আলো । একটা সিগারেট ধরালাম। গন্ধটা বাজে ঠেকল। মনে হল তামাকের বদলে আলকাতরা ভরে দিয়েছে। বিরক্ত হয়ে সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে গুঁজে দিলাম। ভিতরে-ভিতরে ভীষণ চঞ্চল বোধ করছি। কেন জানি না। বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে এলাম । নীচে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। সিমেন্টের উঠানের ঠিক মাঝখানে পিকলু দাঁড়িয়ে। হাতে নাটাই। ওরা কবে এল? এখন রাত প্রায় দুটো বাজে । এত রাতে পিকলুর তো উঠানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা না। জলদি বারান্দায় এলাম। নীচে তাকিয়ে দেখি উঠানে কেউ নেই। ঠিক তখনই বসার ঘরে শব্দ হল। কে যেন চেয়ার সরাল। দ্রুত বারান্দা থেকে বসার ঘরে এলাম। বসার ঘরে আগরবাতির গন্ধ। আশ্চর্য! ঠিক তখনই শোওয়ার ঘর থেকে ‘ঘটাং’ শব্দ হল । শোয়ার ঘরের পুরনো লোহার আলমারীটা খোলার সময় এরকম ‘ঘটাং’ করে শব্দ হয়। আশ্চর্য! এত রাতে কে আলমারী খুলল? মার তো ঘুমিয়ে থাকার কথা। দ্রুত শোয়ার ঘরে এলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আলো জ্বালালাম। নাঃ, আলমারী বন্ধ। ঘরের ঠিক মাঝখানে বড় একটি পুরনো আমলের পালঙ্ক। তারই একপাশে মা গুটিশুটি মেরে শুয়ে। পাশে ফুপু নেই। ফুপু গেল কই? বাথরুমের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। দরজার নীচে আলো । পানি পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম । ওহ্, ফুপু তাহলে বাথরুমে? ঘরের আলো নিভিয়ে আমি ঘরে ফিরে আসি। একবার জানালায় উঁকি দিই। নাঃ, নীচের উঠানে কেউ নেই। কেবল সাদা জোছনার আলোয় ভরে আছে। নাহ্, আমারই মনের ভুল। পর দিন দুপুর। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরেছি । মা তৈরি হয়ে ছিল। জিগ্যেস করলাম, মরিয়ম ফুপু কি তালতলা যাবে? মা বলল, না। সকাল থেকে মরিয়ম বুর শরীর খারাপ। ঘুমায় আছে। থাক, ঘুমাক তাহলে। বললাম। নীচে নেমে আমি আর মা পাশাপাশি হাঁটছি। বাসস্টপটা কাছেই। বাসস্টপ থেকে আপেল- কমলা কিনে বাসে উঠলাম। তালতলা জায়গাটা কাছেই। পৌঁছতে সময় লাগবে না। সাত কিলোমিটারের মতো বাসরাস্তা । বাসে মাকে বললাম, মরিয়ম ফুপু আমাদের ঠিক কেমন আত্মীয় হয় বল তো ? মা বলল, মরিয়ম বু তোর আব্বার ফুপাত বোন। তোর আব্বার সঙ্গে মরিয়ম বু-র বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। মরিয়ম বুর আব্বা বিয়াতে রাজি হয় নাই। তারপর জোর কইরা মরিয়মের জগদীশপুর বিয়া দেয়। ও। তাহলে মরিয়ম ফুপুর একটা বিষন্ন অতীত আছে? তার টানেই এসেছে? এখন বেশ বুঝতে পারছি বাবার মুখে কেন কখনও মরিয়ম ফুপুর কথা শুনিনি। কেন বাবা কখনও জগদীশপুরের কথাও বলেনি। তবু খটকা গেল না। মরিয়ম ফুপু বাড়ি চিনলেন কি করে? বৃদ্ধা মানুষ। একা এলেনই বা কি করে? মা বলল, আমার বিয়ার পর মরিয়ম বুরে একবার দেখছিলাম। তিরিশ বছর আগে। আমারে হিংসা করে মরিয়ম বু। হিংসা করে কেন? আমি অবাক। তর আব্বা লগে আমার বিয়া হইল বইলা। ও। এরপর মা বলল, কালাই আমারে মরিয়ম বু জিগ্যাস করল, তোমার বিয়ার গয়নাগাঁটি সব কি করছ মমতাজ। কইলাম, বাদলের বিয়া ঠিক হইছে। গয়নাগাঁটি আমি ওর বৌয়েরে হাতে দিমু। দেখি মরিয়ম বুর মুখ কেমন কালো হয়ে গেল। কইল, তৈয়ব ভাইয়ের লগে আমার বিয়া হইলে গয়নাগাঁটি আমিই পাইতাম। শুনে অবাক হয়ে গেলাম। তালতলা অনেক দিন পরে এলাম। পাঁচ-সাত বছর তো হবেই। কেবল শহর নয়, এখন মফঃস্বলের
লোকজনের মধ্যেও দূরত্ব বেড়েছে। তালতলায় সেতারা ফুপুদের টিন সেডের বাড়িটি গাছপালায় ঘেরা। বাড়ির সামনে উঠান। বাঁ পাশে গোয়াল ঘর। জামরুল গাছ। পুকুর । ছেলেবেলায় ওই পুকুরে অনেক দাপাদাপি করে। মনিরুল ভাই পোলট্রির ব্যবসা ছাড়াও মাছ চাষও করে । পুকুর পাড়ে ঘন বাঁশ ঝাড়। অস্থির বাতাসে শরশর শব্দ। বাসে ওঠার পর আকাশে মেঘ জমেছে। বৃষ্টি হতে পারে। উঠানে মনিরুল ভাইয়ের বউ সালমা ভাবী দাঁড়িয়ে। কাপড় তুলছিল। আমাদের দেখে হাসল। তারপর দৌড়ে বারান্দায় কাপড় রেখে ফিরে এসে মাকে সালাম করল। বলল, আসেন। ঘরে আসেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, কেমন আছেন বাদল ভাই? বললাম, ভালো। বলে, আপেল-কমলার ঠোঙা দিলাম সালমা ভাবীর হাতে। সেতারা ফুপু একটা ঘরে শুয়ে আছে। শরীর আগের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গেছে। কালো মুখটা। বিশেষ করে চোখের চারপাশে ঘন কালি জমে আছে। মাথা ন্যাড়া। মনিরুল ভাই গতকালই ইঙ্গিত দিয়েছিল ... ক্যান্সার। মা অনেক ক্ষণ। কাঁদল। দুজনের অনেক কথা হল। বেশির ভাগই পুরনো দিনের। আমি ফুপুর মাথার কাছে বসলাম। ফুপু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। টিনের চালে তখন বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ। ঘরটা অন্ধকার হয়ে এসেছে। সালমা ভাবী পান নিয়ে এল । তারপর ঘরের আলো জ্বালিয়ে বলল, আপনার ভাইরে ফোন করছি। এখনই আসতেছে। মা পান মুখে দিয়ে বলল, মরিয়ম বু আমাগো বাড়িত বেড়াইতে আসছে। কার কথা কও? কোন মরিয়ম? সেতারা ফুপু ক্ষীণ দূর্বল কন্ঠে বললেন। মা বলল, ওই যে মরিয়ম। বাদলের আব্বার ফুপাতো বোন। যার জগদীশপুরে বিয়া হইছিল। সেতারা ফুপু আর্তস্বরে বলল, হায় হায়। কও কি ভাবী ! মরিয়ম তো পাঁচ বছর আগে মারা গেছে। মারা গেছে! কি কও সেতারা বু? বলে মা আমার দিকে তাকাল। আমি থ। মরিয়ম ফুপু মারা গেছে মানে? হ। পাঁচ বছর হইল। সালমা গো বাড়িও জগদীশপুরে। আমরা তখন জগদীশপুরে বেড়াইতে গেছিলাম। সালমাও মরিয়মরে চিনে। হ। চিনি। বলে সালমা মাথা নাড়ল। মনিরুল ভাই এলেন। অনেকটা ভিজে গেছেন। মাকে সালাম করলেন। তারপর সব শুনে মনিরুল ভাইও বললেন: মরিয়ম ফুপু মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। তখন মনিরুল ভাইও জগদীশপুরে ছিলেন। কবর দেওয়ার সময়ও ছিলেন। মা আমার দিকে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল। ফিসফিস করে বলল, এরা কি কয় রে বাদল? তাইলে আমাগো বাড়িতে কে আইল? আমি আর কি বলব। এতগুলো লোক কি আর মিথ্যে কথা বলবে? হঠাৎ আসা বৃষ্টিটা কমে এসেছে। যত শিগগির সম্ভব বাড়ি যাওয়া দরকার। বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম। বাসস্টপ পর্যন্ত ছাতা নিয়ে মনিরুল ভাই এলেন। ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে বাসে ছাড়ল। বাসে মায়ের সঙ্গে তেমন কথা হল না। দুজনে গভীর চিন্তায় ডুবে ছিলাম। মা কেবল একবার বলল, এরা কি কইল রে বাদল। মরিয়ম বু নাকি বাঁইচা নাই। তা হইলে কে আইল? বাড়ি না-ফেরা পর্যন্ত কিছু বলতে পারছি না। বললাম। বাস থেকে নেমে হাঁটছি। ততক্ষণে আবার ঝরঝরে রোদ উঠেছে। তখনও ঘোর কাটেনি। মরিয়ম ফুপুকে আমি গতকাল দু- বার স্পর্শ করেছি। দু- বারই অত্যন্ত শীতল অনুভূতি হয়েছে। মরিয়ম ফুপুর চোখের দৃষ্টিও কেমন নিষ্প্রাণ। মাথায় একটি প্রশ্ন ঘুরছিল: মরিয়ম ফুপু যদি মারাই যাবেন তা হলে আমাদের বাড়ি যে এসেছে সে কে? কেন এসেছে? মরিয়ম ফুপু বাবাকে খুব ভালোবাসত। বাবা মুগের ডালের খিচুরি আর ধনে পাতা দিয়ে রুই মাছ খেতে ভালোবাসে বলে রাঁধল। মায়ের কাছে বিয়ার গয়নাগাঁটি খোঁজ নিল। আশ্চর্য! কাল রাতে ঘরে খুটখাট শব্দ পাচ্ছিলাম। যেন কেউ কিছু খুঁজছে। মরিয়ম ফুপু আমাদের বাড়ি আসার পর থেকেই অদ্ভূত সব ঘটনা ঘটছে। পিকলুকে দেখলাম গতকাল মাঝ রাতে জোছনার ভিতর নীচের উঠানে দাঁড়িয়ে থাকতে। ...
ঘটনা ঘটছে। পিকলুকে দেখলাম গতকাল মাঝ রাতে জোছনার ভিতর নীচের উঠানে দাঁড়িয়ে থাকতে। ... এসব ভেবে আমার কেমন শীত-শীত করতে লাগল। আমি আর মা পাশাপাশি হাঁটছি। দূর থেকে দেখলাম বাড়ির গেটের সামনে পিকলু দাঁড়িয়ে। ওকে দেখে স্বস্তি পেলাম। পিকলুর পরনে হলুদ গেঞ্জি আর নীল হাফ প্যান্ট। হাতে নাটাই। স্কুলের মাঠে যাচ্ছে বলে মনে হল। কাছে এসে বললাম, কি রে, তোরা কখন এলি? একটু আগে। বলে মিষ্টি হাসল। তারপর বলল, দেখ না বাদল ভাই, দাদুবাড়ির হাট থেকে নতুন নাটাই কিনেছি। আমি হেসে মাথা নাড়লাম। একটু পর সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। সিঁড়িতে নাদিরা কে দেখলাম । নীচে নেমে আসছে। মাকে দেখে ভীষণ চমকে উঠল নাদিরা। তারপর ওমাঃ। বলে হাত দিয়ে মুখ চাপা দিল। চশমা পরা ফরসা মুখটা কেমন ভয়ে আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে। চোখে অবিশ্বাসের দৃষ্টি। মায়ের দিকে চেয়ে খসখসে কন্ঠে নাদিরা বলল, আপনি! এখানে! হ। আমি। ক্যান। কি হইছে? তাহলে ঘরে আমি কাকে দেখলাম? কারে দেখলা? নাদিরা বলল, আপনাকে দেখলাম। আপনি আমাকে বিয়ের শাড়ি বের করে দেখালেন। কও কি? দরজা খুলল কে? নাদিরা বলল, কেন আপনি? বললেন, আস মা। বাদল এখনও অফিস থেকে ফেরেনি। আমি বললাম, ঘরে আর কাউকে দেখনি? বৃদ্ধ মতন ? না তো। নাদিরা বলল। আমরা দ্রুত উপরে উঠে এলাম। ফাঁকা ঘর। কেউ নেই। মরিয়ম ফুপুর কই গেল? আশ্চর্য! মা দ্রুত শোবার ঘরে ঢুকল। পালঙ্কের ওপর শাড়ির স্তূপ। এলোমেলো ছড়িয়ে। শাড়িগুলি আমার পরিচিত। নাদিরার বিয়ের শাড়ি। ঘরের আসবাবপত্রগুলি সব ওল্টানো। অগোছালো। আলমারী খোলা। মা আর্তচিৎকার করে আলমারীর কাছে ছুটে গেল । তারপর ঝুঁকে বসে আলমারীর নীচের একটি ড্রয়ার খুলল। তারপর ‘হায় আল্লা’ বলে চিৎকার করে উঠল। কি হল! আমি ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে জিগ্যেস করি। গয়নার বাক্সটা নাই ! মরিয়ম নিয়া গেছে কবরে। গয়না নাদিরারে দিব না। কথাটা শুনে আমার সারা শরীর জমে যায় ...

পরিবর্তন

"ওকে কিভাবে তৈরি করা হবে? " " কেন যেভাবে ভাবা হয়েছিল" "তাহলে দেরী কেন?" " শুরু হোক" " কোথা থেকে শুরু হবে?" "মাঝ থেকে-মেরুদন্ডের মাঝ থেকে" .......................................................................................... দিন ১ কোমরের মাঝে প্রচন্ড ব্যাথা। চিনচিনে ব্যাথা। হটাত হটাত ব্যাথার ঢেঊ উঠে ঊঠে আসছে মাথার দিকে। যখন আসে তখন চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। আশে পাশে কেউ নেই। একা একা থাকি। কাউকে জানাতে ও পারছিনা।মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা শুরু হচ্ছে হটাত হটাত। এরকম ব্যাথা কল্পনাই করা যায় না। কি হবে আমার? উফফ- বসলে উঠতে পারিনা। উঠলে বসতে পারিনা। ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। আশে পাশে কোন ডাক্তার ও নেই। কার কাছে যাব। থাকি মফস্বলের এই বাসায়। তাও একা। সকালে অফিসে খাই। রাতে অনেক দুরের হোটেল থেকে খেয়ে আসি। এখন কিভাবে আমি ডাক্তার এর কাছে যাব? একজন ডাক্তার আছেন। কিন্তু তাও অনেক দূরে। দেখি সময় করে যেতে হবে।কিন্তু একা একা কিভাবে যাব বুঝতে পারছিনা। বাসায় কেউ থাকলে ভাল হত। দিন ৩ সারা দিন শুয়ে আছি। মাথা ভারী হয়ে গেছে। শরীরের মাঝে যেন একটা লোহার শলাকা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। কিছু বুঝতে পারছিনা। কি হবে এখন? উফ আর পারছিনা। ব্যাথা দিন দিন বাড়ছে। হাই ডোজ এন্টিবায়োটিক এও কোন কাজ করছেনা। কিছু বুঝতে পারছিনা। উফ মাথা ঘুরছে অনেক। মনে হচ্ছে যেন মাথায় তরল আগুন। এই আগুনের শেষ নেই। জ্বলছে তো জ্বলছেই । দিন ৭ ব্যাথা এখন ছড়িয়ে গেছে সারা শরীরে। আমার হাতের কনুই গুলো প্রায় অবশ এখন। আঙ্গুল গুলো নাড়াতে পারি। কিন্তু কেমন যেন অসাড়। পায়ের দিকে তাকাতে পারছিনা। দেখেই ভয় লাগছে। বাম পায়ের গোড়ালি র দিকটায় যেন কেমন ভাবে বেঁকে গেছে। এর ফলাফল কি হবে জানিনা। এখন কুঁজো হয়ে হাঁটতে হচ্ছে। কিন্তু ঠিক সাধারন কুঁজো না। কেমন যেন বেঁকে গেছে পিঠ। ঠিক উলটো ভাবে। আসতে আসতে যেন উলটে যাবে এমন ই মনে হচ্ছে। দিন ১১ মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রনা। পা গুলো প্রচন্ড বেখাপ্পা ভাবে বেঁকে গেছে গতকাল রাতে। আমি বুঝিনি কি হয়েছে। আমি শুধু টের পাচ্ছি আমার শরীরের সব কিছু উলটো হয়ে যাচ্ছে। পায়ের দিকে তাকাতে ভয় লাগছে অনেক। গল্পে পড়তাম ভুতের পায়ের পাতা উলটা হয়। এখন আমার নিজের উলটো পায়ের পাতা দেখে কেমন যেন বমি আসছে আমার। প্রচন্ড যন্ত্রনা সারা শরীর জুড়ে। এই কয় দিন কিছুই খাইনি। কেন যেন খিদে লাগেনি। বুঝতেই পারছিনা। আমি কিভাবে না খেয়ে থাকছি এতদিন সেটাই বিশ্বাস হচ্ছেনা। উফ আর ভাবতে পারছিনা। দিন ১৩ আজকে তের তম দিন। আমাকে এখন আমি নিজেই চিনতে পারছিনা। হয়ত একদিন পর আমাকে আমি নিজেই চিনতে পারবোনা।দাঁত গুলো অনেক লম্বা হয়ে গেছ ভোরের দিকে। কি হবে জানিনা। প্রচন্ড মানসিক চাপ অনুভব করছি। কি হবে জানিনা সব কিছু উলটে গেলে। এখন আমি পুরোপুরি উলটে যাবার অপেক্ষায় আছি। ............................................................................................. “কেমন হল পরিবর্তন?” “ অনেক সুন্দর লাগছে ওকে। ঠিক আমাদের মতই”। “ না আমাদের মত সুন্দর সে নয়। তবে ও যাকে ওর শ্বদন্ত দিয়ে কামড় দেবে-যার রক্ত খাবে তার চেহারা হবে অনেক টা আমাদের মত”। “ হয়ত...... কে জানে”। “ হুম এখন আমি সন্তুষ্ট” “এখন কি করা হবে একে নিয়ে?” “কেন ? যা পরিকল্পনার শেষ ধাপে ছিল তাই হবে” “হুম- তাহলে ওকে এখন লোকালয়ে পাঠানো যাক। দেখি ওর থেকে যার পরিবর্তন হবে সে দেখতে কেমন হবে” “ঠিক। এখন ওকে লোকালয়ে পাঠানো যাক” .......................................................................................... সুমির কোন ভাবেই ঘুম আসছে না। প্রচন্ড মাথা ব্যাথা বলে ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়েছে। কিন্তু ঘুম আসছেনা। বাইরে চাঁদ নেই। নিকষ কালো অন্ধকার। কিন্তু এক স্নিগ্ধ আলো ঘরে প্রবেশ করছে। রাতে এই আলোকে অনেক উপভোগ করে সে। কিন্তু আজকে অনেক বিরক্ত লাগছে এই আলো। কি মনে করে বিছানা থেকে উঠে এসে বারান্দায় দাড়ালো সে। উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিচে রাস্তার
দিকে তাকিয়েই কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল সুমি। নিচে কেউ যেন হামাগুড়ি দিয়ে হেটে চলেছে। উপর থেকে দেখে অনেকটা কুকুরের মত মনে হচ্ছে। এগিয়ে আসছে ওদের বাড়ির দিকেই। হটাত ঠিক নিচে থেমে গেল সুমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর সোজা সুমিদের বাড়ির দেয়াল বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। হটাত ভয় পেয়ে গেল সুমি। তাড়াতাড়ি রুমে ঢুকেই বারান্দায় যাওয়ার দরজাটা বন্ধ করে দিল। ও হয়ত জানেনা- কোন ভাবেই জন্তু টাকে আটকানো যাবেনা। সেটা এগিয়ে আসছে সুমির দিকেই

আস্তিক

আমার নাম রহমান। জুয়েল রহমান। পেশায় ডাক্তার। থাকি ঢাকায়। আমি ভূত বিশ্বাস করি না। ভূত কেন আমিতো ঈশ্বরকেও বিশ্বাস করিনা। যে সময় মানুষ চাঁদে যাচ্ছে, মঙ্গলগ্রহ জয় করার প্রস্তুতি নিচ্ছে , সেই যুগে আমি ভূত নামক মানুষ সৃষ্ট একটা ভ্রান্ত ধারণাকে মনে ঠাঁই দিতে পারিনা। আমার বন্ধুরা আমকে নাস্তিক বলে। বলুক। আমার তাতে কিছু যায় আসে না। আমি আমার বিশ্বাসে অটল। কেউ টিটকারি দিয়ে আমকে আমার বিশ্বাস থেকে একটুও নড়াতে পারবেনা। আমি নাস্তিক। একজন নাস্তিক মানুষ। 6 জুলাই, 2006। রাতে ডিনার করে ইজিচেয়ারে বসে একটা বই পড়ছিলাম। এসময় বিকট শব্দে বেজে উঠল আমার পুরনো আমলের টেলিফোন সেটটা। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শুনতে পেলাম আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবিরের কন্ঠস্বর। কাজ করে করে একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। আবিরকে বলেছিলাম কক্সবাজারের একটা টিকিট কনফার্ম করে রাখতে। একারনেই ফোন করেছে ও। পরশুদিন বিকাল 5 টায় ফ্লাইট। খুশি হয়ে উঠল মনটা। যাক কয়েকটা দিনতো অন্তত নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারব। 8, জুলাই। যথাসময়ে রওনা দিলাম আমি। চট্টগ্রাম পৌঁছতে সন্ধ্যা 7টা বেজে গেল। ট্যাক্সির খোঁজে এদিক ওদিক তাকাতেই একটা ট্যাক্সি এসে আমার সামনে দাঁড়ালো। ট্যাক্সির ড্রাইভারের বয়স বড়জোর 26 কি 27 হবে। কক্সবাজার যাবে কিনা জিজ্ঞাসা করলাম। যাবে। উঠে বসতেই ট্যাক্সি ছাড়ল ও কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলাম। কিন্তু কতক্ষণ আর চুপচাপ বসে থাকা যায়? তাই ঠিক করলাম ড্রাইভার ছেলেটার সাথেই আলাপ জমাবো। “নাম কি তোমার?“ আলাপ জমানোর প্রথম পদক্ষেপ হল প্রথমে অন্যজনের নাম জিজ্ঞাসা করা, তাই নাম দিয়েই আলাপ শুরু করলাম আমি। “জনি,“ একটু হেসে উত্তর দিল সে। ওর কাছ থেকে জানলাম ও গ্রাজুয়েশন করেছে। কিন্তু কোনও চাকরি না পেয়ে শেষে ট্যাক্সি চালানো শুরু করেছে। আলাপ করতে করতেই চারদিকের অন্ধকারাচছন্ন দৃশ্য দেখতে লাগলাম আমি। এক ঘন্টা হয়ে গেছে প্রায়। সিটে হেলান দিয়ে ঝিমাতে লাগলাম আমি। হঠাৎ একটা ঝাঁকুনিতে উঠে বসলাম। “কি ব্যাপার, জনি?“ জিজ্ঞাসা করলাম আমি। “টায়ার পাংচার হয়ে গেছে, স্যার। গাড়িতে এক্সট্রা কোন টায়ারও নাই,“ বিব্রত ভঙ্গিতে উত্তর দিল জনি। “সেকি? এখন কি করব?“ কিছুটা রাগতো স্বরে বললাম আমি। “একটা ফোন করা লাগবে, স্যার“। “ ফোন এখানে কোথায় পাব। নির্জন রাস্তা ছাড়া কোনও বাড়িঘর বা দোকানপাটতো চোখে পড়ছেনা।“ বললাম আমি। হঠাৎ একদিকে আঙুল তুললো জনি “ঐ দেখেন স্যার একটা বাড়ি“। ওর নির্দেশিত দিকে তাকালাম আমি। সত্যিই তো একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। “জনি চলতো দেখি ওই বাড়িতে টেলিফোন পাওয়া যায় কিনা?“ বললাম আমি। বেশী দূরে না বাড়িটা। তবে আমদের অবস্থান থেকে বাড়িটা পর্যন্ত ঘন ঝোপঝারে ভরা। বাড়িটাতে পৌঁছে চারদিকে তাকালাম দরজার খোঁজে। পেয়েও গেলাম দরজাটা। ডোরবেলের খোঁজ করলাম দরজার আশেপাশে, কিন্তু পেলাম না। “চুলোয় যাক ডোরবেল,“ বলে দরজায় নক করল জনি। ভেতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ পেলাম না। এবার জোরে জোরে দরজায় বাড়ি দিতে লাগল ও। একটু পর ভিতর থেকে মৃদু পায়ের আওয়াজ পেলাম। ভীত মুখে বয়স তিরিশেক একজন মহিলা দরজা খুলে দিল। সন্দেহ ভরা দৃষ্টি নিয়ে আমদের দুজনকে দেখল। “কে আপনারা?“ ভীত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি। আমি আমাদের সব সমস্যার কথা খুলে বলতেই ভিতরে ডাকলেন আমাদের। তারপর জনকে দেখিয়ে দিলেন কোন ঘরে টেলিফোন আছে। জন চলে গেল টেলিফোন করতে। ভদ্রমহিলা আমাকে সোফায় বসতে বললেন। বসে থেকে ঘরের চারদিকে চোখ বুলাতে লাগলাম আমি। দেয়ালে দেখলাম ঐ ভদ্রমহিলা এবং এক ভদ্রলোকের ছবি। আমাকে ছবির দিকে তাকাতে দেখে মহিলা নিজেই বললেন “উনি আমার স্বামী, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।” “ওহ! আমি দুঃখিত।” উঁনাকে এই বিষয়ে আর কোন প্রশ্ন করে বিব্রত করতে চাইলামনা। “ আপনারা বসুন, আমি চা নিয়ে আসি,” আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উনি দ্রুত রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। জনি এখনও আসেনি। চুপচাপ বসে আছি। এমন সময় সামনের ঘরের দরজা খুলে গেল।
ভেতর থেকে বের হয়ে আসলো একজন লোক। তাকে দেখেই চমকে উঠলাম আমি। চট করে ছবির দিকে তাকালাম, না কোনও সন্দেহ নেই। ছবির ঐ ভদ্রলোক। ভদ্রলোক আমাকে দেখে অবাক হলেন। “কে আপনি, আমার বাসায় ঢুকলেন কীভাবে?”এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। “আপনি,” ওনার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, “আপনি জীবিত আছেন? কিন্তু উনি যে বললেন.........” “আমি জীবিত আছি মানে? কি বলতে চাইছেন আপনি,” বিস্ময় ফুটে উঠল তার চেহারায়। “আপনার স্ত্রী বললেন আপনি মারা গেছেন,” বললাম আমি। রাগ ফুটে উঠল তার চেহারায়,“ইয়ারকি করছেন আপনি আমার সাথে? কি যাতা বলছেন আমার মৃতা স্ত্রী সম্পর্কে?” “মৃতা স্ত্রী,” বোমা ফাটল যেন আমার কানের পাশে,“কি সব উল্টো পাল্টা কথা বলছেন আপনি, আপনার স্ত্রী তো বেঁচে আছেন। চা বানাতে গেছেন আমাদের জন্য,“ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। “দেখুন যথেষ্ট হয়েছে, একেতো বিনা অনুমতিতে আমার বাড়িতে ঢুকেছেন, আবার আমার মৃতা স্ত্রী সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলছেন। আমি..........।” কথা শেষ করতে পারলেননা উনি কারণ জনি এসে দাঁড়িয়েছে দরজার সামনে। অবাক হয়ে জনির দিকে তাকালেন তিনি। “তুমি কে,” তার কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি “ কেউ কি আমকে বলবে কি হচেছ এখনে?” “দেখুন মিস্টার....... ,” “আমান, আমি আমান চৌধুরি,” ধরিয়ে দিলেন তিনি। “ওকে, মিস্টার আমান চৌধুরি, দেখুন আমদের গাড়ির টায়ার আপনার বাড়ির সামনে এসে পাংচার হয়ে যায়, আমরা আপনার দরজা নক করতে আপনার স্ত্রী দরজা খুলে দেয় আর আমকে এখানে বসায়ে রেখে উনি চা বানাতে গেছেন, দয়া করে রান্নাঘরে যেয়ে উনাকে জিজ্ঞাসা করুন।” “আমি জানিনা আপনি কি বলছেন, কিন্তু আমার স্ত্রী গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন,” বললেন আমান চৌধুরি। “What the hell you are talking about,” প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, “আমরা একটু আগে উনার সাথে কথা বলেছি, জনি তুমিই বল।” “ আমি জানিনা আপনারা নেশা করেছেন কিনা কিন্তু আমার স্ত্রী গতবছরই মারা গেছে।” “Please trust me, MR. Aman, আমরা দুজন একসাথে ভুল দেখতে পারিনা।” “তাহলে আপনারা নিশ্চয়ই ওর আত্মাকে দেখেছেন,” রাগ সরে গিয়ে হাসি হাসি হয়ে উঠল তার মুখটা। “আত্মা! কি বলছেন আপনি?” “ঠিকই বলছি, কারণ এখন আমি ওর আত্মাকে আপনাদের পিছনে দেখতে পাচ্ছি।” পিছনে ঘুরেই চমকে গেলাম আমরা, ঐ মহিলাই হাস্যজ্বল মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। “সরি মিস্টার..... , ওহ আপনার নামটাই তো জানা হয়নি, যাইহোক আমি পলি চৌধুরী, আমানের স্ত্রী।” হাসিমুখে বললেন উনি। “ আমরা সত্যিই দুঃখিত মিস্টার.......” জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে আমান চৌধুরি তাকালেন আমার দিকে। “রহমান, আমি জুয়েল রহমান।” নাম বললাম আমি। “ওকে, মিস্টার জুয়েল রহমান, আমরা সত্যিই দুঃখিত, জাস্ট একটু ফান করলাম আপনাদের সাথে।” “ফান?” বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম আমি। “হ্যা, ফান। আসলে আমরা দুজন লোকালয় থেকে অনেক দূরে থাকি। দুজনের সংসার। জরুরী কাজ ছাড়া শহরে যাওয়া হয় না খুব একটা। মানুষের সাথে খুব বেশী মেশাও হয় না। একেবারে রসকষহীন জীবনযাপন করি। তাই জানালা দিয়ে আপনাদের আসতে দেখে ভাবলাম একটু ফান করা যাক। তাই দুজনে একটু ভূতের অভিনয় করলাম। যাইহোক ভাই, কিছু মনে করেন না।” হাসলেন আমান চৌধুরি। হাসলাম আমিও। এতক্ষণে সব বুঝতে পারলাম। জনির মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছিল এইসব কাণ্ড কারখানা দেখে। এবার সব কিছু বুঝতে পেরে শান্ত হয়ে আমার পাশে এসে বসল। মিসেস আমান আমাদের চা নাশতা পরিবেশন করলেন। একটু পর দরজায় শব্দ হল। মেকানিক এসে গেছে। দশ মিনিটও লাগলনা টায়ার পাল্টাতে। মিস্টার এবং মিসেস আমানকে বিদায় জানায়ে আমি আর জনি আবার রওনা হলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সাড়ে দশটা বেজে গেছে। “স্যার, খুব ভয় পেয়েছিলেন বুঝি,” জনি জিজ্ঞেস করল। “ভয়? হেসে উঠলাম আমি। “এই জুয়েল রহমান কখনও ভয় পায়না, জনি। আমি যদি পৃথিবীতে কিছু অবিশ্বাস করি তা হল ভূত আর ঈশ্বর।” জনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। তাকাক। সবাই তাকায়। আমার এতে কিছু যায় আসে না। “স্যার, ভূতও আছে, ঈশ্বরও আছে। আপনি এটা অস্বীকার করতে পারেননা।” জনির কথার ধরন দেখে অবাক হলাম। “আচ্ছা? তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছ কীভাবে? কীভাবে তুমি এত জোর গলায় বলছ যে ভূত আছে?” হঠাৎ গাড়ি একটা জোরে ঝাঁকি খেয়ে থেমে গেল। আমার দিকে ঘুরলো জনি। ধ্বক করে উঠল আমার
বুকটা। দেখলাম যেখানে জনির চোখজোড়া ছিল সেখানে এখন শুধু শুন্য কোটর ভয়ংকর ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। “আমি এত জোর দিয়ে বলছি কারণ আমি নিজেই ভূত, স্যার।” ঘড়ঘড়ে কন্ঠে বলল জনি। হঠাৎ দেখলাম জনির চামড়া আস্তে আস্তে খসে পরতে লাগল। ঠোঁট দুটো খসে গিয়ে সেখানে উঁকি দিল ভয়ংকর কাল দাঁতসহ কুৎসিত লাল মাড়ি। পচা মাংসের তীব্র গন্ধে ভরে গেল গাড়ির ভিতরটা। কিছুক্ষণ পরে ওর দেহে আর মাংস বা চামড়া বলে কিছু থাকল না। শুধু একটা ভয়ংকর কঙ্কাল বিদঘুটে ভাবে আমার দিকে চেয়ে থাকল। অজান্তেই তীব্র চিৎকার বেরিয়ে আসল আমার গলা থেকে। কিন্তু এই নির্জন জায়গায় আমার চিৎকার শোনার কেউ নাই। গাড়ির দরজা খোলার চেষ্টা করলাম কিন্তু হাতদুটো যেন অসাড় হয়ে গেছে, যেন কেউ সম্মোহিত করে রেখেছে আমকে। আবার কুৎসিত কঙ্কালটার দিকে তাকালাম। দেখলাম ধীরে ধীরে ওটা একটা কুৎসিত হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে আমার দিকে। 9 জুলাই। সন্ধ্যা 7 টা বাজছে প্রায়। আমি চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টের সামনে ট্যাক্সির ভিতর বসে আছি। অপেক্ষা করছি একজন প্যাসেঞ্জারের জন্য। শুধু আমি না আমার মত আরও অনেক ভূত অপেক্ষা করছে ট্যাক্সি নিয়ে। একজন প্যাসেঞ্জার পেলেই তাকে নিয়ে রওয়ানা হয়ে যাব। চট্টগ্রাম হাইওয়ে থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা নির্জন জায়গায় নিয়ে তাকে খুন করব যেভাবে জনি কাল আমকে খুন করেছিল। আস্তেআস্তে প্রচুর ভূত বাড়াতে হবে আমাদের দলে। আফটারঅল কিছুদিন পরে পৃথিবীর সব মানুষ খুন করে আমরা ভূতেরাই তো পৃথিবীর উপর রাজত্ব করব। এখন আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। এখন আমি আস্তিক। একজন আস্তিক ভূত।

ফোঁড়া

অনেক ক্ষন ধরে সামনে বসা মানুষ টার দিকে তাকিয়ে আছেন ডঃ তাহসিনা। মাথাটা নিচু করে বসেই আছে সেই লোক। অনেকক্ষণ ধরে বসে থেকে থেকে শেষে বলতে শুরু করল- "আমার যে সমস্যা সেটা হল আমার পেটে একটা ফোঁড়া ঊঠেছে।" বলেই শুন্য দৃষ্টিতে ডঃ তাহসিনার দিকে তাকিয়ে থাকল। ডঃ তাহসিনা অনেক ভাল একজন সাইকায়াট্রিষ্ট। উনি এর আগে ও অনেক মেন্টাল রুগীকে ভাল করেছেন। কিন্তু আজকের এই রুগি এসে বসেছে তো বসেছে কথা বলার কোন নাম গন্ধ নাই। অনেক ক্ষন মাথা নিচু করে চুপ করে থেকে শেষে বলতে শুরু করল। " আমার সমস্যার শুরু যখন আমি আমার স্ত্রি মাহমুদা কে খুন করি। আমার স্ত্রি কে নিয়ে আমি খুব সুখে ছিলাম। কিন্তু আমার একটা এক্সিডেন্টের কারনে ডাক্তার আমাকে বলেন যে আমি আর কোন দিন বাবা হতে পারবোনা। এর পর মাহমুদা আমাকে প্রথম প্রথম মেনে নিয়েছিল। আমাদের বিয়ে হবার পর ঠিক করেছিলাম ৩ বছর পর বাচ্চা নেব। এর মাঝেই ঘটে যায় সেই এক্সিডেন্ট। এরপর মাস ছয়েক ঠিক ছিল। কিন্তু একদিন আমি জানতে পারি মাহমুদার সাথে আমার এক আত্মীয়র অবৈধ সম্পর্ক হয়েছে। এটা শোনার পর আমার মাথা ঠিক ছিলনা। আমি দুইবার আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। এর মাঝেই আমাকে মাহমুদা ওর অবৈধ সম্পর্কের কথা জানায়। আমি বিমূঢ় ছিলাম বেশ কিছু দিন। কিন্তু এর মাঝেই জানতে পারি মাহমুদা কনসিভ করেছে। এটা শুনে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। ওর পেটে বাচ্চা যখন ৮ মাস - তখন আমি একদিন মাহমুদা কে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলি। মেরে ফেলি পেটের বাচ্চা টাকে ও। আমি একজন পুলিশ অফিসার ছিলাম সেই সময়। এখন আমি রিটায়ার্ড। সেই সময় আমার ক্ষমতা বলে মাহমুদা কে আমি আমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কোন রকমে দাফন করে আসি। এর পর আমি অনেক দিন দেশের বাইরে ছিলাম।" বলেই একবার দম নিল লোকটা। তারপর টেবিল থেকে পানির জগটা নিয়ে অদ্ভুত ভাবে পানি গ্লাসে না ঢেলে জগ থেকেই ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল অর্ধেক পানি। তারপর আরেকটা দম নিয়ে আবার বলা শুরু করল সে - " এর পরের বছর আমি দেশে ফিরে আসি। চাকরি থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। সেখানে আবার জয়েন করি। কিন্তু দুই মাস আগে আমি ঈদের ছুটিতে গ্রামে যাই। সেখানে ঈদের দিন রাতে আমি একাকী বসে ছিলাম আমার বাড়ির পেছনের বারান্দায়। তখন দেখি মাহমুদার কবর থেকে একটা বাচ্চা ছেলে বাবা বাবা করে ডেকে আমার দিকে দৌড়ে এসে আমার মাঝে ঢুকে গেছে। সেদিন রাতে আমি খানিকটা নেশা করেছিলাম। তাই সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে সব আজগুবি মনে করে ভুলে যাই। কিন্তু পরদিন আমার পেটে নাভীর গোড়ায় একটা ফোঁড়া ঊঠে। প্রথমে এটা ফোঁড়ার মতই ছিল কিন্তু আস্তে আস্তে এটা বড় হতে থাকে। আমি এই কয়দিন প্রায় সময় স্বপ্নে দেখছি একটা বাচ্চা ছেলে আমাকে বাবা বাবা করে ডাকছে আর বলছে আমার পেট থেকে নাকি তার জন্ম হবে। এই যে দেখেন আমার পেটের মাঝে এটা কি”- বলে শার্টের ভাজ খুলে দেখায় ডঃ তাহসিনাকে। তাহসিনা কিছুক্ষন দেখেন ফোঁড়া টা। বেশ বড় আকারের একটা ফোঁড়া। লালচে ভাব ধরেছে। তারপর হেসে লোকটাকে বললেন- “দেখুন মি.”- বলে নামটা জানার জন্য তাকালেন উতসুক দৃষ্টিতে লোকটার দিকে। উনি বললেন “ রাকিব- মোঃ রাকিব”। “হুম – দেখুন রাকিব সাহেব- আপনার হ্যালুসিনেশন হয়েছিল- সেই দিন রাতে। আপনি আপনার স্ত্রীকে অনেক ভালবাসতেন। সেই ভালবাসা আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। তাই আপনি উনাকে এবং উনার সন্তান কে মেরে ফেলে অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেইদিন আপনার পিতৃসত্ত্বা আপনার মাঝে আপনার মৃত সন্তান কে ঢুকে যেতে দেখিয়েছে। এটা নিছক ই কল্পনা। আর বেশি কিছু না”। বলে মিষ্টি করে হেসে রাকিব সাহেবের দিকে তাকালেন। “ কিন্তু আমার পেটের এই ফোঁড়া কিভাবে আসল?” এবার ক্ষেপে গেলেন রাকিব সাহেব। “এটা কো- ইন্সিডেন্স মাত্র। এটার সাথে আপনার স্বপ্ন কিনবা হ্যালুসিনেশন কে মেলালে তো চলবেনা”- বললেন ডঃ তাহসিনা।
“ দেখেন আমি মেলাচ্ছিনা। কিন্তু ইদানিন আমার পেটের ভেতর কিছু একটা লাথি মারে। কিছু একটা হচ্ছে আমার পেটের ভেতর”- বলেই প্রায় কেঁদে ফেলে রাকিব সাহেব। “ দেখুন আপনাকে আমি কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি। এগুলো খান। আশা করি আপনার ভাল ঘুম হবে। এবং আপনার এই বিশাল ফোঁড়া ও কমে যাবে” বলেই খস খস করে কিছু ঔষধ লিখে প্যাড থেকে কাগজ ছিড়ে দেন রাকিব সাহেব কে। তারপর বললেন-“ আপনার যে কোন সমস্যা হলে আমি নিজে গিয়ে আপনাকে দেখে আসব। আপনার এখানে আসার আর দরকার নেই। এইখানে আমার ফোন নাম্বার দেয়া আছে। সেখান থেকে আমাকে ফোনে জানাবেন কি হয়েছে”- বলেই ঊঠে পড়লেন ডঃ তাহসিনা। “আমার একটা সেমিনার আছে- আমাকে এখন সেখানে যেতে হবে” বলে বের হয়ে গেলেন ডঃ তাহসিনা। .............. তিন মাস পর রাত ১টায় ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল ডঃ তাহসিনার। উনি ফোনটা ধরেই আরেক পাশ থেকে শুনতে পেলেন- রাকিব সাহেবের কন্ঠ- “ আপা একটু আসবেন আমার বাসায়? প্লিজ আপা আসেন।প্লিজ আসেন। আমার পেটে প্রচন্ড ব্যাথা করছে” বলেই বাসার ঠিকানা দিলেন ডঃ তাহসিনাকে। সারাদিন মেডিক্যাল এ সেমিনারে ছিলেন তিনি। তাই বাসায় এসে মাত্র শুয়েছেন। কিন্তু এই রকম কল এলে প্রায় সময় তিনি ঘুম রেখেই দৌড় মারেন রূগীর বাসায়। নিজের জীবনের চেয়ে রোগীকে অনেক গুরুত্ব দেন তিনি। আর এই রাকিব সাহেবের ব্যাপারটা নিয়ে তিনি অনেক পড়াশুনা করেছেন ইদানিন। তাই তিনি এত রাতে ফোন পেয়ে কোন রকমে পোশাক পাল্টে গাড়ি নিয়ে বের হলেন। রাকিব সাহেবের বাসায় বাসা গুলশানে। সেখানে পৌছে একটা সাদা রঙ এর বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি থামিয়ে নিজেই ঢুকে পড়লেন ভেতরে। বাড়িতে গিয়ে বেল টেপার পর খুলে দিল একজন বৃদ্ধা মহিলা। তিনি রাকিব সাহেব কোথায় জিজ্ঞাসা করতেই মহিলা তাহসিনাকে নিয়ে গেলেন একটা ঘরে। সেখানে শুয়ে আছেন রাকিব সাহেব। কিন্তু রাকিব সাহেব কে দেখেই ভয় পেয়ে যান তিনি।রাকিব সাহেবের পেটটা অস্বাভাবিক ভাবে ফোলা। ঠিক যেন সন্তান সম্ভবা মায়ের মত। আর ঠিক সেই সময় রাকিব সাহেব চিৎকার করে ঊঠে অজ্ঞান হয়ে যান। এবং সেই সময় তাহসিনার চোখের সামনে ঘটল এক বিষ্ম্য় কর ব্যাপার। রাকিব সাহেবের নাভির উপরের ফোঁড়া থেকে একটা লালচে পিণ্ড বের হতে লাগল। আস্তে আস্তে পিন্ড টার কিছু অংশ বের হয়ে চোখ আর মুখে অস্তিত্ব জানান দিল। এর পর তাহসিনা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে দেয়া মহিলা কে গামছা আর কুসুম গরম পানি আনতে বলে নিজে কোন রকম টান দিয়ে বের করেন বাচ্চা টাকে। অদ্ভুত সুন্দর সেই সন্তান টাকে কোলে নিয়ে হতভম্ভ হয়ে যান তিনি। বাচ্চা টা যেন ঘুমাচ্ছে। এর মাঝে তোয়ালে নিয়ে সেই মহিলা আসলে তিনি তোয়ালে দিয়ে কোন রকম বাচ্চা টাকে মুছিয়ে দেন। তারপর খেয়াল করেন বাচ্চা টা কাঁদছে না। তিনি অনেক চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনভাবেই বাচ্চাটাকে কাঁদাতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত দেখলেন বাচ্চাটা মারা গেছে। বাচ্চাটা মারা যাবার পর তিনি রাকিব সাহেবের দিকে খেয়াল দিলেন। এতক্ষন তিনি যেন ঘোরের মাঝে ছিলেন। মেডিক্যাল সায়েন্স কে বোকা বানিয়ে এই মাত্র এই লোকটা একটা বাচ্চা জন্ম দিল। কিন্তু বাচ্চাটাকে তিনি বাঁচাতে পারলেন না। আগে জানলে তিনি ঠিক ই রাকিব সাহেবের ব্যাবস্থা করতেন। তিনি তাড়াতাড়ি রাকিব সাহেব এর নার্ভ দেখলেন। কিন্তু হতাশ হলেন। তিনি ভেবেছিলেন রাকিব সাহেব অজ্ঞান হয়েছেন। আসলে তিনি মারা গেছেন সেই চিৎকার দিয়েই। এবার কিছু টা মুষড়ে পড়লেন তাহসিনা। তিনি লোকটাকে বিশ্বাস করলে দুইজন কেই হয়ত বাচানো যেত। এরপর তাহসিনা সেই বাচ্চাটাকে গোপনে সরিয়ে ফেলার ব্যাবস্থা করেন। সেই বৃদ্ধা মহিলা কে দিয়েই বাচ্চাটাকে সেই বাড়ির এক কোনায় কবর দেবার ব্যাবস্থা করেন। আর রাকিব সাহেব কে কবর দেয়া হয় তার গ্রামের বাড়িতে। এই সব ব্যাপার ভাল মত সারতে সারতে উনার কয়েকদিন লেগে যায়। এর তিন দিন পর রাতে ক্লান্ত ডঃ তাহসিনা মাত্র হাসপাতাল থেকে এসে বাসায় খেয়ে দেয়ে শুয়েছেন। এমন সময় উনার ঘরের বারান্দায় একটা আলতো টোকা দেয় কেউ একজন। তখন ও ঘুমান নি তাহসিনা। আস্তে করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে ঊঠে বারান্দার দরজা খুলেই দেখেন একটা বাচ্চা ছেলে দাড়িয়ে আছে দরজার ওপাশে। মুখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে আন্টি আন্টি বলে ঝাপিয়ে পরে তাহসিনার শরীরের সাথে মিশে যায়। ব্যাপারটা এতই তাড়াতাড়ি হয়েছে যে তাহসিনা বেশ কিছুক্ষন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়লেন তিনি সেখানেই। পরদিন জ্ঞান ফিরে নিজেকে মাটিতে দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যান তিনি।তারপর রাতের ঘটনা কে নিছক স্বপ্ন ভেবে হেসে ঊড়িয়ে দিলেন তিনি। তারপর ফ্রেশ হবার জন্য বাথরুমে গেলেন। হাত মুখ ধুয়ে বের হতে যাবেন তখন পেটে চিনচিনে একটা ব্যাথা টের পেলেন। তাড়াতাড়ি নাইট গাঊনটা সরিয়ে পেটে হাত বুলালেন তিনি। এবং দিনের আলোতেই পরিষ্কার টের পেলেন তিনি – উনার পেটের যেখানে নাভি- ঠিক তার উপরেই একটা ফোঁড়া ঊঠেছে। লালচে ফোঁড়াটা দেখতে ঠিক রাকিব সাহেবের সেই ফোঁড়াটার মত। সাদৃশ্য টা টের পেতেই আবার জ্ঞান হারালেন সাইকিয়াট্রিষ্ট ডঃ তাহসিনা......

পৌনপুনিক

একা একা কম্পিউটারের সামনে বসে আছে নাহিদ। কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাঁদছে সে। মেসে থাকে অনেকে মিলে- সবার সামনে থাকলে কাঁদতে পারেনা। তাই একা একা বাথরুমে গিয়ে কেঁদেছিল। কিন্তু কাঁদা শেষ হবার আগেই বাথরুমের দরজায় টোকা পড়ে- বের হয়ে আস্তে হয় ওকে। এখন ওর রুমে ওর দুই রুমমেট নেই- বাইরে গেছে সিগারেট খেতে। এই সুযোগে কেঁদে নিচ্ছে সে। এমন সময় রুপম এসে ঢুকল। নাহিদের ক্লাস মেট রুপম ওর সাথেই ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। কিন্তু বড়লোক বাবার ছেলে বলে নাহিদের মত অভাব নেই ওর। নাহিদ এখন খুব কষ্টে আছে। প্রাইভেট ইঊনিভারসিটি তে পড়ছে- অনেক টাকা প্রতি সেমিষ্টার ফি দিতে হয় ওকে। এই মাসেই চলতি সেমিষ্টার ফি দিতে হবে ওকে- এখন ও দিতে পারেনি। কিভাবে পারবে? ওর বাবা মারা গেছেন এক বছর হল। সরকারী চাকরি করতেন তিনি- চাকরির মাঝেই হার্ট এটাক করে মারা যান তিনি। তাই পেনশনের টাকা হাতে পায়নি নাহিদ। বাড়িতে মা আর বোন থাকে- পড়ালেখার খরচ চালান নাহিদের মা। উনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র পড়ান। আর নাহিদ ও টিউশনি করে চালায়। কিন্তু এই মাসে হটাত করে দুইটা টিউশনি চলে যাউ নাহিদের। তিনটা টিউশনি র মাঝে যেটা বাকি ছিল সেটা তে যে টাকা পায় তাতে নিজের থাকার খরচ ই মেটাতে পারেনা। এখন কিভাবে সেমিষ্টার ফি দেবে সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে কেঁদে ফেলল সে। রুমে ঢুকেই রুপম বলল- "দোস্ত- তুমি কি ঐ প্রকাশকের কাছে গেসিলা?" প্রকাশকের কথা শুনে মন আরো খারাপ হয়ে গেল তার। গতমাসে ওর লেখা একটা গল্প সংকলন নিয়ে গিয়েছিল বাংলাবাজারে প্রভৃতি প্রকাশনের মালিক দিদার সাহেবের কাছে। উনি ঘোষনা দিয়েছিলেন যে একটা প্রতিযোগিতা হবে- সেখানে যে প্রথম হবে তাদের বিনামুল্যে বই বের করে দেয়া হবে একুশে বইমেলায়। নাহিদ ও পাঠিয়েছিল সেই প্রতিযোগিতায়। অনেক গল্প লিখেছে নাহিদ। কিন্তু প্রতিযোগিতার কথা শুনে সে গল্প গুলো নতুন করে লিখে একটা পান্ডুলিপি বানিয়ে পাঠিয়েছিল প্রভৃতি প্রকাশনীতে। সেখানে সে প্রথম হয়েছিল। কথা মত ওকে বই বের করে দিচ্ছে কিন্তু বই বের করা বাবদ ওর কাছে চাইছে দশহাজার টাকা। প্রতিযোগিতার শর্তে এটা লেখা ছিলনা। এমনিতেই ও অনেক গরীব। এর মাঝে ফ্রি তে বই বের করে দেবে চিন্তা করেই টেবিলের কোনায় পড়ে থাকা গল্প গুলো বই আকারে চেয়েছিল। সাথে দশ হাজার টাকা উপহার ও পাওয়ার যোগ ছিল। এখন সেটা বেমালুম অস্বীকার করছে প্রকাশনী প্রধান। তাই মন খারাপ করে বলল সে- "হ্যাঁ গিয়েছিলাম। ঐ একই কথা বলল সে। কোন ভাবেই আমাকে দশ হাজার টাকা দেবে না। বলেছে টাকা আমাকে ই দিতে হবে এবং সেটা তিন দিনের ভেতর। না দিলে যে ২য় হয়েছে তাকেই বই বের করে দেয়া হবে। এজন্য তিন দিনের মাঝেই বই এর জন্য টাকা দিতে হবে। "
বলেই যেন মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল নাহিদের। ওকে সান্তনা দিল রুপম। কিন্তু সবাই ওকে সান্তনাই দিল- কেউ ওর বিপদে এগিয়ে আসল না। বাস্তবতা তার করুন চিত্র যেন নিজের চোখে খুটে খুটে দেখাচ্ছে নাহিদ কে। না খেয়েই শুয়ে পড়ল নাহিদ। রাতে না খেলে একটা মিল বেঁচে যাবে- সেই টাকা দিয়ে সেমিষ্টার ফি কিছুটা ও হলে দেয়া যাবে ভেবে পানি খেয়ে পেট ভর্তি করে শুয়ে পড়ল সে। সারাদিন দৌড়া দৌড়ী করে কাহিল ছিল শরীর। তাই শুতেই ঘুমিয়ে পড়ল সে। ঘড়িতে যখন ঠিক দুইটা- এমন সময় ওর মোবাইলে একটা ফোন আসল। ঘুমের মাঝে ফোনটা কোন ভাবে কেটে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে গেল সে। ঘুমিয়ে থাকলে কারো ফোন রিসিভ করেনা সে। আজো করবেনা ভেবে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। একটু পর আবার রিং আসতেই আবার কেটে দিল। এবার মোটামুটি ঘুম ভেঙ্গে গেলে ও প্রাইভেট নাম্বার দেখে রিসিভ করেনি। রাতে বিরাতে জীনের বাদশা র মত কিছু ভন্ড মানূষ কে ফোন করে ভয় দেখায়। অনেক সময় সেই নাম্বার গুলো প্রাইভেট নাম্বার হয়। এটা ভেবেই ফোনটা ধরেনি সে। একটু পরেই তৃতীয় বার রিং বাজতেই ফোনটা রিসিভ করল সে। করেই বললঃ "হ্যালো " ওপাশ থেকে কোন উত্তর আসছেনা দেখে আবার বললঃ "হ্যালো- কে বলছেন?" কোন উত্তর নেই। এবার ক্ষেপে গেল সে- চিৎকার করে বললঃ " কে বলছেন? কথা বলছেন না কেন? ফোন করতে পারেন- কথা বলতে পারেন না?" এবার কেমন যেন খর খর আওয়াজ শুরু হল মোবাইল থেকে। কেমন যেন অদ্ভুত রকম একটা আওয়াজ। আস্তে আস্তে আওয়াজ এর উচ্চতা বেড়েই চলেছে। অদ্ভুত রকম সাঁ সাঁ আওয়াজ করেতে শুরু করল ওর মোবাইল থেকে। শেষে বিরক্ত হয়ে যখন রেখে দিতে যাবে তখন যেন অনেক দূর থেকে একটা কন্ঠ বলে ঊঠল- “হ্যালো”। কন্ঠ টা শুনে হটাত করে শোয়া থেকে সটান বসে পড়ল সে। বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হয়ে গেল তার। এই কণ্ঠ আর কারো না- ওর মৃত বাবার। এই কন্ঠ কোন ভাবেই অন্য কারো হতে পারেনা। সে কণ্ঠ টা আবার শোনার জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করল। এবার মিনিট খানেক পরে আবার বলে ঊঠল- -‘হ্যালো’ এবার আর দেরী করল না সে- কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ঊঠল- -কে? বাবা? বলেই কেঁদে ফেলল সে- বুক থেকে যেন বের হতে যাইছে এক বছরের জমে থাকা দুঃখ গুলো। কোনভাবেই নিজেকে থামাতে পারছেনা। মোবাইলেই কাঁদতে কাঁদতে বলল- “বাবা সত্যিই কি তুমি বলছ বাবা? সত্যিই তুমি?” বলেই উত্তরের অপেক্ষা শুরু করল- ওপাশ থেকে বলল- -“হ্যাঁ রে- তুই ভাল আছিস তো? বাবু সোনা?” বাম হাতে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল- -“এইত বাবা আছি- কিন্তু তোমাকে অনেক অনেক মনে পড়ে বাবা। অনেক... তুমি নেই- যেন আমার আসলেই কেউ নেই- তুমি ছাড়া কেউ আমার খেয়াল রাখেনা বাবা”- বলেই হাউমাঊ করে কেঁদে ফেলল আবার নাহিদ। -“ হ্যাঁ রে কাদিস না- শোন আমি যে তোকে ফোন করেছি সেটা কাউকে বলিস না- আর আমি এখন যা যা বলব তুই সেটাই করবি- তাহলে তোর লেখা পড়া থেমে যাবেনা- তুই আবার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবি” -ওপাশ থেকে বলল নাহিদের বাবা। -“ বাবা তুমি যা যা বলবে আমি তা তা করব বাবা শুধু তুমি একবার বল- কি করতে হবে আমাকে ? -কেঁদে কেদেই বলে চলল নাহিদ। “শোন – তুই যেখানে লেখা দিয়েছিস- সেটার পেছনে একটা দোকান আছে- সেখানে এক বৃদ্ধ লোক বসে- উনাকে তোর লেখা টা কালকেই দেখাবি। উনি তোর লেখা ছাপিয়ে দেবেন। তোকে উনি কালকেই দশ হাজার টাকা ও দেবেন । সেই টাকা দিয়ে তুই তোর সেমিষ্টার ফি দিবি- কি পারবিনা?” অপাশ থেকে জিজ্ঞাসু ভঙ্গিমা। “ কিন্তু উনি কি আমার লেখা ছাপাবেন?” নাহিদের কন্ঠে বিস্ময়। “উনি তোর মত একজন কে খুঁজছে। কাল ঠিক বেলা ১১টায় উনার কাছে একজন লোক আসার কথা। কালকে খিলগাঁও এলাকায় ফ্লাইওভার এ ফাটল দেখা দেবে। সেই জন্য বিশাল জ্যামে পড়বে সেই লোক। তুই এই ফাঁকে আগে থেকে চলে যাবি বাংলাবাজার। ঠিক এগারোটায় সেখানে গিয়ে দেখা করবি বৃদ্ধের সাথে। এরপর তোকে আর টাকা নিয়ে ভাবতে হবেনা। আমি এখন রাখি রে- ভাল থাকিস- সব সময় তোর মায়ের দিকে খেয়াল রাখবি। রানু কে ভালমত মানুষ করবি। রাখি” – বলেই খট করে ফোন রেখে দিল ওপাশ থেকে। কিছু ক্ষন জেগে জেগে ভাবল নাহিদ। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ল সে। পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ই প্রথমে ফটোকপি র দোকান এ গিয়ে দোকানদার কে ঘুম থেকে জাগিয়ে লেখা গুলোর কপি করে নিল। তারপর
পান্ডুলিপি বানিয়ে রওনা দিল বাংলা বাজারের দিকে। সেখানে প্রভৃতি প্রকাশনের আশে পাশে ঘোরাঘুরি করল কিছুক্ষন। তারপর সময় কাটেনা দেখে রাস্তায় এসে কিছু ক্ষন হাটাহাটি করল। একে একে দশটায় সব দোকন খুলে গেল। সে প্রভৃতি প্রকাশনের বাইরে অপেক্ষা করছিল- এমন সময় প্রভৃতি প্রকাশনের পাশের দোকান খুলে ঢুকল এক আশি ছুই ছুই বৃদ্ধ। উনার প্রকাশনীর নাম “আদিত্য প্রকাশন”। এগারোটা বাজতেই আস্তে করে দরজা দিয়ে ঢুকে বৃদ্ধের দিকে পান্ডুলিপি এগিয়ে দিল নাহিদ। বৃদ্ধ যেন আগে থেকে ই জানত সে আসবে। কিছুক্ষন কিছু পৃষ্টা উলটে পালটে দেখে বৃদ্ধ ওকে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিল। তারপর কাগজ কলম এগিয়ে দিল। সে পড়ে দেখল একটা ২০০ টাকার স্টাম্প। সেখানে অনেক অনেক কথা লেখা। সে আস্তে আস্তে পড়ে তারপর সাক্ষর দিয়ে বের হয়ে আসল সেখান থেকে। সে বের হয়ে আসতেই একজন লোক দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বৃদ্ধের কাছে আসল। ঐ লোক কে দেখেই নাহিদ ঐ খান থেকে চলে আসল তাড়াহুড়া করে। এই ব্যাপার টা নিয়ে সেই আদিত্য প্রকাশনী থেকে খানিকটা সমস্যা হলেও শেষ পর্যন্ত নাহিদের বই বই মেলায় বের হল এবং চারদিকে ওর সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। যেন এক ঝটকায় ভাগ্য লক্ষ্মী ওকে খুলে দিল এক অবারিত সম্ভাবনার দ্বার। ......................................................... ঠিক ৩৫ বছর পর প্রখ্যাত লেখক নাহিদ হাসান উনার পঞ্চম সিনেমার পরিচালনা থেকে ফিরে মাত্র বাসায় এসে বসেছেন। রাত বাজে দুইটা। উনি ইদানিন অনেক বেশী ব্যাস্ত। ডিজিটাল মিডিয়াতে উনার বর্তমান সিনেমা “জীবনের গল্প” যেটা উনার নিজের জীবন নিয়েই বানাচ্ছেন সেটা নিয়ে ব্যাপক প্রচারনা হয়েছে। ফলে উনি কাটাচ্ছেন অনেক কর্ম ব্যাস্ত দিন। আশা করছেন এই সিনেমা অস্কারে মনোনিত হবে। গতবছর একটুর জন্য অস্কার হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল একটা মালেশিয়ান সিনেমার জন্য। এবার উনাকে কেউ হারাতে পারবেনা- চিন্তা করতে করতে খানিকটা ঘুমিয়েছেন- এমন সময় উনার মোবাইলে একটা ফোন আসল। উনি ফোন ধরেই বললেন- “ নাহিদ হাসান বলছি- কে বলছেন?” ওপাশ থেকে কিছুক্ষন খস খস আওয়াজ করার পর কে যেন বলে ঊঠল- “ কেমন আছো নাহিদ?” গলাটা শুনেই ৩৫ বছর পর আবার চমকে ঊঠলেন তিনি। মনে পড়ে গেল ঊনার বাবার কথা। সেই ৩৫ বছর আগে তিনি ফোন করেছিলেন। তারপর এতদিন পর তিনি আবার ফোন করলেন। আস্তে আস্তে অপাশ থেকে বলে ঊঠলেন- “নাহিদ- কেমন আছো? আশা করি- ভাল আছ- শুনো- একটু পর আমি তোমাকে একটা লাইন দেব- সেখানে কে আছে জানার দরকার নেই- শুধু তুমি কথা বলবে”- বলেই থামলেন কেউ ওপাশ থেকে। “কার সাথে কথা বলব আমি বাবা?” নাহিদ সাহেবের কন্ঠে সেই বিস্ময়। “ তোমার জানার দরকার নেই। শুধু তুমি জেনে রাখ তূমি যা যা বলবে সব তোমার স্মৃটি থেকে। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে রাতে তুমি ফোনে যা যা শুনেছিলে তাই তাই বলবে- একটা কথা ও বেশী বলবে না। একটা অক্ষর ও বেশী বা কম বলবে না। আমি এখন তোমাকে লাইনে দিচ্ছি”— বলেই খুট করে শব্দ হল একটা। নাহিদ সাহেব হাঁ করে তাকিয়ে আছেন- এ রকম কিছু একটা হবে তিনি জীবনে ও ভাবতে পারেন নি। কেউ একজন উনাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন কোথায় কিভাবে গিয়ে লেখা জমা দিতে হবে। এখন উনাকে এই কথা টা আরেক জনকে বলতে হবে- ভেবেই গলাটা শুকিয়ে গেল। ফোন কানে রেখেই এক গ্লাস পানি ঢক ঢক করে খেলেন তিনি। তারপর আবার ফোনে মনযোগ দিলেন তিনি। অপাশ থেকে শুধু খর খর শব্দ হচ্ছে। কিছুক্ষন খর খর শব্দের পর চিনচিনে একটা শব্দ শুরু হল। তিনি বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দেবেন এমন সময় ওপাশ থেকে কেউ একজন বলে ঊঠল – “হ্যালো” কণ্ঠটা শুনেই বুকটা ধরাস করে ঊঠল উনার। গলাটা শুকিয়ে গেল এক নিমিশেই। কারন এই কন্ঠ তিনি খুব ভাল করে চিনেন।উনার কোন রকম ভুল হচ্ছেনা। ভুল হবার কথা ও না। ওপাশ থেকে যে ফোন ধরেছে সে আর কেউ নয়- ৩৫ বছর আগের সেই নাহিদ হাসান- এখন কার বিখ্যাত নাহিদ হাসান নিজে ...

নীলশঙ্খ

রামু থেকে গর্জনিয়া যাওয়ার পথে বাসে একজন মাঝবয়েসি ভিক্ষু আমাকে বলল, খুব শিগগির নাকি আমি এক ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়ব । কথাটা শুনে আমি সাঙ্ঘাতিক রকমের ঘাবড়ে গেলাম। আমার ঘাবড়ে হওয়ারই কথা। কারণ ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়া তো ভারী সাঙ্ঘাতিক ঘটনা। তা ছাড়া আমি এর আগে কখনও ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়িনি। সত্যিকারের ডাকিনীরা দেখতে কেমন হয়, তাও জানি না। তবে এই ইন্টারনেটের যুগেও যে ডাকিনীর মুখোমুখি হওয়া সম্ভব, সেকথা ভেবেও খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম । তবে ভিক্ষু আমাকে অভয় দিয়ে বলল, অসুবিধে নেই। এই শঙ্খটি ডাকিনীর হাত থেকে রক্ষা করবে । বলে আমার ডান বাহুতে ভিক্ষু একটা ছোট নীল রঙের শঙ্খ বেঁধে দিল। অবশ্য মন্ত্রপূতঃ নীল শঙ্খটি শরীরে ধারণ করে কোনওরকম টের পেলাম না। চট্টগ্রাম থেকে রামু পৌঁছেছি দুপুর নাগাদ। একটা হোটেলে ঢুকে খেয়ে- দেয়ে আবার গর্জনিয়ার বাসে ওঠার পর ভিক্ষুর সঙ্গে পরিচয়। ভিক্ষু মুখ গম্ভীর। মাঝবয়েসি যে তা আগেই বলেছি। যথারীতি মঙ্গোলয়েড মুখ। মাথা নিখুঁত ভাবে কামানো। পরনে লাল রঙের গেরুয়া (বৌদ্ধরা চীবর বলে ) । ভিক্ষুকে আমি আমার নাম বললাম। গর্জনিয়া যাওয়ার কারণও বললাম। ভিক্ষুও গর্জনিয়া যাবে। ওখানেই একটা মঠে নাকি থাকে। নাম এথিন লামা। ভিক্ষুর নাম ‘এথিন লামা’ শুনে অবাক। এথিন লামা বলল, তার জন্ম রামুতে হলেও তরুণ বয়েসে তিব্বতে চলে গিয়েছিল। প্রায় তিরিশ বছর তিব্বতের একটি নির্জন গুম্ফায় ছিল। পাঞ্চেন নামে এক লামার কাছে গুপ্ত তন্ত্রবিদ্যা অধ্যয়ন করেছে। তারপর রামুতে ফিরে এসেছে। রামুর লোকজন তাকে এথিন লামা বলেই ডাকে । এথিন লামা নাকি অশুভ শক্তি নাশ করে। এই উদ্দেশ্যে এখানে- ওখানে ঘুরে বেড়ায়। এসব শুনে আমি কৌতূহল বোধ করি। তিব্বত নিয়ে আমার উৎসাহ আছে। শুনেছি তিব্বতের লামারা নানা গুপ্তমন্ত্র জানে। তারা নাকি উড়তেও পারে। কথাটা সত্যি কিনা জিগ্যেস করতেই এথিন লামা কিছু না- বলে মিটমিট
করে হাসতে লাগল। গর্জনিয়া পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হল। বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশে কড়–ই গাছের নীচে দাঁড়ালাম। ছোট খালু আমাকে এখানেই অপেক্ষা করতে বলেছেন। ছোট খালু রামু তে সেটেল করার পর থেকে আমায় অনেকবার যেতে বলছেন । যাব- যাব করেও এর আগে আসা হয়নি। এবার এইচ এস সি পরীক্ষার পর ফুসরত মিলল । রামু থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব মাত্র ২৫ কিলোমিটার । মনে সমুদ্র দেখার লোভও ছিল। আমার পাশে এথিন লামাও দাঁড়িয়েছে। জায়গাটা বাজারের মতো। রাস্তার দু’পাশে স্থানীয় আদিবাসীরা বাঁশের ঝুড়িতে আদা, আনারস, কাঁকরোল, কাঁচা কলা নিয়ে বসেছে। গর্জনিয়া রামুরই একটি ইউনিয়নে । রামু সদরের অনেকটা পুবে। প্রচুর আনারস আর আদা ফলে। বৌদ্ধ মন্দিরের জন্যও বিখ্যাত গর্জনিয়া। কাছেই রাস্তার ওপারে একটি বৌদ্ধ মঠ। এথিন লামা হাত তুলে মঠটি দেখিয়ে বলল, আমি ওই মঠেই থাকি। বেশ বড় মঠ। কাঠের। চূড়টি ধবধবে সাদা। সুন্দর। বললাম। এথিন লামা হাসল। কড়–ই গাছের নীচে একটা চা স্টল। বেঞ্চ। একটি অল্প বয়েসি রাখাইন ছেলে চা বানাচ্ছে। এরই মধ্যে আমার এথিন লামার সঙ্গে বেশ খাতির হয়ে গেছে। হাজার হলেও আমাকে একটি নীলশঙ্খ উপহার দিয়েছে। কাজেই বললাম, চলেন, চা খাই। এথিন লামা রাজি। আমার সঙ্গে বেঞ্চিতে চা খেতে বসে। চা খাওয়া শেষ। বললাম, আজ আর সময় হবে না। কাল সকালের দিকে আপনার মঠে আসব। এথিন লামা মাথা নাড়ল। দাঁত বের করে হাসল। ঠিক তখনই দূর থেকে রাস্তার ওপারে ছোট খালু কে একটি কাকাও গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমি এথিন লামার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তা পার হয়ে ছোট খালুর কাছে যেতেই খালু আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বললেন, আয়। ছোট খালু আগে চট্টগ্রামে মোটর পার্টসের ব্যবসা করতেন । তার আগে সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। এখন ওসব ছেড়ে গর্জনিয়ায় জমি কিনে আদা আর আনারস চাষ করছেন। ছোট টিলার ওপর বাংলো বাড়ি করেছেন। ছোট খালা-খালুর একটাই মেয়ে। সাদিয়া আপা আমেরিকায় পড়াশোনা করছে। বৌদ্ধ মঠের পাশ দিয়ে উঠে গেছে বাঁকানো লাল মাটির পথ। দু’ পাশে রেইনট্রি আর ইউক্যালিপটাস। শেষবেলায় অজস্র পাখি কিচিরমিচির করছে। একটা খরগোশ
দৌড়ে রাস্তা পাড় হল। গাছ থেকে সরসর করে নেমে এল একটা কাঠবেড়ালী। আর ঝিঁঝির ডাকে কান পাতা দায়। চারিদিকে মনোরম আলো ছড়িয়ে আছে। গাছতলায় কেমন ছায়া- ছায়া। কী সুন্দর জায়গা। রোমেল কে মিস করছি। রোমেল আমার বন্ধু। একই কলেজ থেকে এবার এইচ এস সি দিয়েছি। রোমেলও গর্জনিয়া আসতে চেয়েছিল। হঠাৎ জ্বরে পড়ল বেচারা। পথটা যেখানে শেষ হল সেখানে সাদা রং করা কাঠের বেড়া। মাঝখানে গেট। দু’পাশে দুটো ইপিল ইপিল গাছ। তারপর লন। এক পাশে ফুলের গাছ। অন্য পাশে ছবির মতো সাদা রং করা কাঠের একটা বাংলো। একতলা আর দোতলায় বিদেশি স্টাইলের গরাদহীন জানালা। জানালার ফ্রেমের রং সবুজ। মনে হল রূপকথার রাজ্যে চলে এসেছি। বাংলোর পিছনের ঢালে সম্ভবত আদার খেত আর আনারস বাগান। বাংলোর সামনে একটা জিপ। মিলি খালা আমাকে দেখে এগিয়ে এল। বলল, এলি শেষ পর্যন্ত? আমি হাসলাম। ছোট খালু বললেন, মিলি তোমরা বসে কথা বল। আমি চট করে একবার বাজার থেকে ঘুরে আসি। বলে ছোট খালু জিপের দিকে এগিয়ে গেলেন। মিলি খালা বললেন, খরগোশ পেলে এনো কিন্তু। শান্তা খরগোশের মাংস খেতে চেয়েছে। ওকে। বলে ছোট খালু জিপে উঠে স্টার্ট নিয়ে চলে গেলেন। সূর্য ডুবতে এখনও অনেক দেরি । শেষবেলায় চারিদিকে যথেষ্ট আলো ছিল। আমরা লনেই বসলাম। বেতের চেয়ার পাতা ছিল। এলোমেলো ফুরফুরে বাতাস বইছিল। আকাশের রং বদলে যাচ্ছিল দ্রুত। একজন অল্পবয়েসি ছেলে এল। হাতে ট্রে। ট্রেতে চায়ের পট আর কাপ। ছেলেটির গড়ন ছোটখাটো , শরীর হলদে রঙের । গলায় সাদা শঙ্খের মাদুলি। ছেলেটির পরনে সবুজ রঙের সারং আর সাদা রঙের ফতুয়া। ছেলেটিকে রাখাইন বলে মনে হল। রামুতে রাখাইনদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। টেবিলের ওপর চা রেখে চলে গেল ছেলেটি। মিলি খালা ঝুঁকে চায়ের কাপ তুলে নিতে নিতে বলল, ওর নাম মং ছিং। ছেলেটা রাখাইন। বৌদ্ধ। বেশ বিশ্বস্ত। আর ধার্মিক। এথিন নামে এক তান্ত্রিক লামার শিষ্য মং ছিং । আমি চায়ের কাপ তুলেছি, চুমুক দেওয়ার আগে আমার হাত শূন্যে থমকে গেল। বললাম, এথিন লামা মানে- নীচের ওই বৌদ্ধ মঠে থাকে ? হ্যাঁ। তুই চিনলি কি করে? মিলি খালার এবার অবাক হওয়ার পালা। গর্জনিয়া আসার সময় বাসে দেখা হয়েছে। বললাম। চায়ে চুমুক দিলাম। ও। জানিস আবীর। ভিক্ষু এথিন নাকি শূন্যে ভাসতে পারে। তাই? এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। এথিন লামার সঙ্গে কত কথা হল, কই এ ব্যাপারে তো সে কিছু বলেনি । অকাল্ট সায়েন্স নিয়ে মিলি খালার বেশ আগ্রহ আছে। মিলি খালার লাইব্রেরিতে অকাল্ট সায়েন্স বিষয়ক অনেক বই আছে। এথিন লামা সম্বন্ধে তার জানারই কথা। মিলি খালা বলল, মং ছিং নাকি এথিন লামাকে একবার উড়তে দেখেছে। আমি জিগ্যেস করলাম, সত্যি কি তিব্বতের লামারা উড়তে পারে? মিলি খালা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, না। সবাই পারে না। কেউ কেউ পারে, যাদের কাজ হল পৃথিবী থেকে অশুভ শক্তি দূর করা, শুধু তারাই পারে । আর যখন কেউই লামাদের আকাশে উড়তে দেখেনি তখন অবিশ্বাস করার কোনও মানে হয় না। তুমি কখনও এথিন লামাকে উড়তে দেখেছ? না। তবে মং ছিং উড়তে দেখেছে। মং ছিং মিথ্যে কথা বলার লোক না। অন্তত আমাদের কাছে । তিব্বতের লামাদের ওপর লেখা তোকে একটা বই দেব পড়তে। বইটা পড়লেই সব বুঝতে পারবি। আমি কি বলতে যাব ... দূর থেকে একটা মেয়েকে আসতে দেখলাম। পরনে ফোলা সাদা শার্ট আর নীল রঙের লং স্কার্ট । পায়ে কেডস। মুখটা খুব চেনা চেনা ঠেকল। মেয়েটা কাছে আসতেই
আমি ভয়ানক চমকে উঠলাম। মেয়েটি বেশ লম্বা। এক মাথা কোঁকড়া চুল। শ্যামলা মিষ্টি চেহারা। চোখে চশমা। ছোট খালা বলল, আবীর। এ হল শান্তা। এবার এইচ এস সি দিল। আমার এক বান্ধবীর মেয়ে। শান্তারা সিলেট থাকে। শান্তা আজ সকালেই এসেছে। কিছুদিন বেড়াবে এখানে। ওহ! আমার শরীরে হিমস্রোত বয়ে যায়। শান্তাকে আমি এর আগে দেখেছি। তবে ঠিক সামনাসামনি নয়, রোমেলদের পারিবারিক অ্যালবামে শান্তার ছবি দেখেছি। সিউর। আমার ভুল হওয়ার কথা না। রোমেলকে আমি জিগ্যেস করেছিলাম, এই মেয়েটির কি নাম রে? রোমেল বলল, শান্তা। আমার খালাতো বোন স্বপ্নার বান্ধবী। (স্বপ্নারা সিলেট থাকে, রোমেলের কাছেই জেনেছি ...) আমি বললাম, কী মায়াবী চেহারা। রোমেল বলল, গত বছর শান্তারা সপরিবারে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিল। শান্তার এক মামা রামুতে থাকেন। কক্সবাজার থেকে রামুতে যাওয়ার সময় রামুতে একটা বৌদ্ধবিহারের কাছে রোড অ্যাক্সিডেন্টে শান্তাসহ সবাই মারা যায়। শান্তাকে দেখে এটাই আমার চমকে ওঠার কারণ। আমি ঘামতে থাকি। আমার গলা ভীষণ শুকনো ঠেকছে। মিলি খালা বললেন, আয় শান্তা। বস । চা খা। শান্তা বসল। বসে মেয়েটি আমার দিকে সরাসরি তাকাল। কী শীতল দৃষ্টি। মনে হল আমি যে ওর ছবি দেখেছি সেটা ও জানে। মিলি খালা বলল, অনেক দিন থেকেই শান্তাকে এখানে আসতে বলছি। এদ্দিনে সময় হল। শান্তার এক মামা রামু থাকেন । ভদ্রলোক সরকারি ইঞ্জিনিয়ার। তিনিই আজ সকালে শান্তাকে নামিয়ে দিলেন। দু-তিন দিন পর আবার নিয়ে যাবেন। আমি ঘামছি। শান্তার দিকে তাকিয়ে মিলি খালা বলল, এ হল আমার বড় আপার ছেলে। আবীর। আবীরও এবার এইচ এস সি দিল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে লনে ফুটফুটে জোছনা ছড়াল। ছোট খালা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোরা বসে গল্প কর আবীর। আমি দেখি মং ছিং রান্নার কদ্দূর কি করল। আজ ছোট আলু দিয়ে খরগোশ রাঁধব। ছোট খালা চলে যাওয়ার পর চারিদিকে তাকিয়ে শান্তা বলল, কী সুন্দর জোছনা। চল, এখানে বসে না থেকে হেঁটে আসি। বলে উঠে দাঁড়াল। আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালাম। শান্তার সঙ্গে আমার দূরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না । লনের ওপর পাশাপাশি আমরা হাঁটছি। লনের ঘাসে আমার লম্বা ছায়া পড়লেও শান্তার ছায়া পড়েনি। আমার কেমন শীত শীত করে। ফুরফুরে বাতাস বইলেও কেমন এক আঁষটে গন্ধ পাচ্ছি। আজ এথিন লামা আমাকে বলল, খুব শিগগির নাকি আমি এক ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়ব । আমি ডানবাহু স্পর্শ করি। নীলশঙ্খের স্পর্শে স্বস্তি বোধ করি । শান্তা বলল, আমি তোমাকে এর আগে কোথায় দেখেছি। কোথায়? আমার কন্ঠস্বর কেঁপে উঠল। আমাকে তো ওর দেখার কথা নয়। উত্তর না- দিয়ে শান্তা জিগ্যেস করল, আমাকে কি তুমি এর আগে কোথাও দেখেছ? না। সত্যি করে বল? শান্তার কন্ঠস্বর এই
মুহূর্তে বুড়িদের মতো কেমন খনখনে শোনাচ্ছে। আমি কি বলব? আমি কি শান্তাকে বলব যে রোমেলের বাসায় তোমার ছবি দেখেছি? তুমি আসলে মৃত। রামুর কাছেই কোথাও অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছ। এসব কথা কি বলা যায়? আমরা হাঁটতে- হাঁটতে লনের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। আমরা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, ঠিক সেখানেই একটি কফি গাছ। টিলাটি এখানে ঢালু হয়ে অন্তত তিনশ ফুট নীচে নেমে গেছে। ধবল জোছনায় টিলার ঢালে শাল গাছ, কলা গাছ, কাঁঠাল গাছ এমন কী নীচের রাস্তাও পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। রাস্তার পাশে মঠের চূড়াও চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। আমার কেন যেন মনে হল শান্তা আমাকে ইচ্ছে করে টিলার কিনারে নিয়ে এসেছে। কেন? শান্তার উদ্দেশ্য ঠিক বোঝা গেল না। তবে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলাম। ওর চোখে মনি দুটি ফসফরাসের মতন জ্বলজ্বল করছে। জ্বলজ্বলে চোখে বারবার আমার ডান বাহুর দিকে তাকাচ্ছে। যেখানে এথিন লামা ছোট্ট নীল শঙ্খ বেধে দিয়েছে। মনে হল ওই নীলশঙ্খের ওপর শান্তার আক্রোশ। শান্তা বলল, তোমার ডান বাহুতে কি একটা নীল রঙের শঙ্খ বাঁধা আছে? হ্যাঁ। আমি চমকে উঠলাম। বললাম, তুমি জানলে কি করে? খসখসে কন্ঠে শান্তা বলল, আমি জানি। তুমি এখন ওই নীলশঙ্খটা বাহু থেকে খুলে নীচে ফেলে দাও। নীলশঙ্খ ফেলে দেব? কেন? আমার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে। শান্তা ধমকের সুরে বলল, ওসব মাদুলিতে কাজ হয় না। তারপর কন্ঠস্বর নরম করে বলল। তা ছাড়া আমি তোমাকে আজ রাতে আশ্চর্য এক দেশে নিয়ে যাব । যেখানে দিনও হয় না রাতও হয় না ... শান্তার কথা শেষ হল না ... কফি গাছের ওপাশ থেকে কে যেন বেরিয়ে এল। খসখসে কন্ঠে বলল, কেমন আছ? কে? আমি চমকে উঠলাম। আমি ... আমি এথিন লামা। ওহ্ । আপনি? কিন্তু এথিন লামা এখানে এল কী ভাবে? উড়ে আসেনি তো। তবে এথিন লামাকে দেখে শান্তা যে ভয় পেয়েছে তা ঠিকই বুঝতে পারলাম। শান্তার মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। আমার দিকে ফিসফিস করে বলল, চল, এখান থেকে চলে যাই। ওই লোকটা ভালো না। আমি কতকটা রুক্ষ কন্ঠে বললাম, তুমি যাও । আমি আসছি। শান্তা দ্রুত হাঁটতে থাকে। পিছন দিকে একবারও ফিরে তাকাল না। আমি মুখ ফিরিয়ে কফি গাছের দিকে তাকিয়ে দেখি ওখানে এথিন লামা নেই। যেন এথিন লামা আসেনি। গভীর বিস্ময় নিয়ে বাংলোয় ফিরে এলাম। রাতে খাওয়া তেমন জমল না। খরগোশের মাংস রাবারের মতো ঠেকল। ছোট খালু সেনাবাহিনীতে থাকার সময় বান্দরবানের গভীর অরণ্যে অজগর শিকারের কাহিনী বলছেন। শান্তা মন দিয়ে শুনে যাচ্ছে। তেমন কিছু খেল না শান্তা। আমি কিচেনে এলাম। মং ছিং প্লেট-গ্লাস ধুচ্ছিল। মিলি খালা চুলার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে দুধ ভরতি সসপ্যান। মিলি খালাকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করলাম, শান্তার মা তোমার ঠিক কি রকম বান্ধবী হয় বল তো ? মিলি খালা ভ্রুঁ কুঁচকে বলল, কেন রে? হঠাৎ? এমনি । বল না। ছোট খালা বলল, শান্তার মা সাবিহার সঙ্গে কলেজে পড়েছি। তারপর ওর বিয়ে হয়ে গেল। মাঝে- মাঝে টেলিফোনে যোগাযোগ ছিল। এই। অনেক দিন দেখাসাক্ষাৎ হয় না, না? আমি জিগ্যেস করি। হ্যাঁ। তুই জানলি কি করে? মিলি খালাকে অবাক মনে হল। তার পর
মিলি খালা বলল, সকালে আমার কিন্তু খটকা লাগল আবীর । কি? আজ সকালে শান্তা যখন এল। তখন বললাম, বাড়ি চিনলে কি করে? শান্তা এড়িয়ে গেল। বলল, ওর এক মামা টিলার নীচে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। ভদ্রলোক ওপরে উঠে এলেন না বলে কেমন খটকা লাগল। শান্তার সঙ্গে কোনও ব্যাগট্যাগও ছিল না। হুমম। আমি শরীরে শিরশিরানি আর কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ নিয়ে দোতলায় উঠে এলাম। তার আগে মিলি খালার লাইব্রেরি থেকে একটা বই নিয়ে এলাম। দোতলার সিঁড়ির পরে ছোট করিডোর। অল্প পাওয়ারের নীল আলো জ্বলে ছিল। ডান পাশের প্রথম ঘরটি আমার। ঘরটা ছোট। তবে গরাদহীন জানালাটা বেশ বড়। বিছানায় শুয়ে এ.আর আরভিং -এর লেখা ‘টিবেটান মিষ্ট্রি অভ ফ্লাইং লামা’ বইটি পড়ছি। মন বসছে না। কেবল শান্তার মুখটা ভাসছিল। রোমেল বলল, গত বছর শান্তারা সপরিবারে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে রামুর কাছে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। মিলি খালা বললেন, শান্তাকে আজ সকালে ওর এক মামা দিয়ে গেলেন। ঠিক কোথায় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল? শান্তা যদি অ্যাক্সিডেন্টে মারাই যায় তাহলে শান্তা এলই- বা কেন? কী ভাবে এল? মৃত্যুর পরও কি বেঁচে থাকা সম্ভব? এসব চিন্তা সরিয়ে বই পড়ার চেষ্টা করি। ‘টিবেটান মিষ্ট্রি অভ ফ্লাইং লামা’ বইটি মিলি খালার লাইব্রেরি থেকে এনেছি। লামারা উড়তে পারে কি না সেটাই জানতে ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ নেভির সদস্য এ.আর আরভিং তিব্বতে গিয়েছিলেন। বইতে সে অভিজ্ঞতাই বর্ণনা করেছেন এ. আর আরভিং। তিনি নাকি লামাদের উড়তে দেখেছেন। কিন্তু কথাটা কতটুকু সত্যি? এথিন লামাও কি উড়তে পারে? মং ছিং নাকি এথিন লামাকে উড়তে দেখেছে। ঘুম আসছিল না। ঘর অন্ধকার। ঘরে রিডিং ল্যাম্পের আলো। সে আলোয় হঠাৎ দেখি দরজার কাছে শান্তা দাঁড়িয়ে। দরজা তো বন্ধ ছিল। ও এল কি করে? শান্তার পরনে সাদা নাইটি। আমি আতঙ্ক সিদে হয়ে বসি। হাত থেকে বই খসে যায়। শান্তা খনখনে কন্ঠে বলল, তখন তুমি কিচেনে মিলি খালাকে বললে আমাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর করতে ? আমি চমকে উঠলাম। ও জানল কি করে? কিচেনে মং ছিং ছাড়া অন্য কেউ ছিল না । মুহূর্তেই আমি এক লাফে জানালার কাছে চলে আসি। গরাদহীন জানালাটা খোলা। জানালার ওপাশে একটি গালিচা। শূন্যে ভাসছে। গালিচার ওপরে দাঁড়িয়ে এথিন লামা। আমি বিস্মিত হব কী- পরক্ষণেই নিজেকে গালিচার ওপর আবিস্কার করলাম। গালিচা খানিকটা সরে অনেকখানি ওপরে উঠে এল। ঠিক লনের ওপর। জোছনার আলোয় লন আলোকিত। যেন দিন। নীচে তাকিয়ে দেখি জানালা দিয়ে অনেকখানি কয়লার গুঁড়া ছিটকে বেরিয়ে এসে ঘূর্নির আকার ধারণ করল। গালিচা দুলছিল। কয়লার গুঁড়া নারীমূর্তি ধারণ করে গালিচা ঘিরে আকাশে ঘুরপাক খেতে লাগল। আর রক্ত হিম করা খল খল হাসি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ।এথিন লামা চারপাশে নীল রশ্মি ছুঁড়ে মারতে লাগল। কালো নারীমূর্তি শূন্যে মিলিয়ে গেল। নীচে তাকিয়ে দেখি লনে ছোট খালু, মিলি খালা আর মং ছিং এসে দাঁড়িয়েছে । মিলি খালা চিৎকার করে কী যেন বলছে। এথিন লামা ধীরে ধীরে গালিচা নামিয়ে আনল। গালিচা থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি। তোর কোনও ক্ষতি হয়নি তে? বলে মিলি খালা আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি লজ্জ্বা পেলাম। আমি তো আর ছোটটি তো নই। মং ছিং ঝুঁকে এথিন লামাকে প্রণাম করল। হাজার হলেও গুরু। ছোট খালু বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। লামাদের শূন্যে ওড়ার দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়েছেন। এথিন লামা হাসছিল। বলল, কদিন আগে মঠে বসে ধ্যান করার সময় জেনেছিলাম এমনই এক ঘটনা ঘটবে। তাই রামুতে বাসে উঠে এর পাশে বসি। বলে আমাকে দেখাল। আমার মনে পড়ল এথিন লামা আমার বাহুতে ছোট নীলশঙ্খ বেঁধে দিয়েছিল। বাহু স্পর্শ করে নীলশঙ্খটা ঠিক জায়গায় আছে বলে নিশ্চিন্ত হলাম। শঙ্খটি এথিন লামা তিববতের মানস সরোবরের পাড়ে কুড়িয়ে পেয়েছিল। ওটাই তো আমাকে ডাকিনী শান্তার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। আবার যে ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়ব না কে বলতে পারে।

ওরা

গতকাল রাতের মতো আজও মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেল তার। মনে হল তার মুখের ওপর কে যেন ঝুঁকে আছে। চোখ খুললেই জানালা গলে ঢোকা স্ট্রিট লাইটের আলোয় মুখটা দেখতে পাবে। তার শরীরজুড়ে আতঙ্কের হিমস্রোত বয়ে যায় । চোখ বুজে থাকে সে। গতকাল রাতের মতো আজও পারফিউমের মৃদুগন্ধ পেল সে। আর চুড়ির রিনরিন শব্দ । 'আফসানা' বলে কে যেন কাকে মৃদুস্বরে ডাকল। কে যেন হেসে উঠল। বাচ্চা মেয়ের কন্ঠস্বর। কারা ওরা? এ বাড়িতে সে একাই থাকে । তার শরীর ভিজে যায়। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল সে ... ঘরের বড় জানালাটা গলে ঝলমলে রোদ ঢুকেছে সকালবেলা। জানালার ওপাশে নাড়কেল পাতারা কাঁপছিল । গতরাতের ভয়টা এই মুহূর্তে মিথ্যা মনে হয় তার। সে আড়মোড়া ভাঙল। অফিসের জন্য তৈরি হতে হবে। বাথরুমে ঢোকার আগে ঘরগুলি একবার ঘুরে ঘুরে দেখল। তিনরুমের বাড়ি। প্রতিটি ঘরই ফাঁকা। একাই থাকে বলে আসবাবপত্র নেই। শোওয়ার ঘরেও বিছানা নেই। মেঝেতে একটা তোষক ফেলে রেখেছে। আর কটা প্লাস্টিকের চেয়ার। ছুটির দিনে অফিসের দারোয়ান এসে ঘরদোর পরিস্কার করে দিয়ে যায়। এ বাড়িতে রান্নাবান্নার ব্যবস্থাও রাখেনি । সকালবেলা অফিসে যাওয়ার পথে কোনও একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে নাশতা সেরে নেয়। দুপুরে খাবার পিয়নকে দিয়ে আনিয়ে অফিসে খেয়ে নেয়। অফিসের পর সময় কাটানো মুশকিল। মফঃস্বল শহরের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে । তারপর রাত আটটা- নটার দিকে কোনও রেস্টুরেন্টে খেয়ে বাড়ি ফেরে। গোছল সেরে, কাপড় বদলে, ঘর তালা দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এল সে । তার অফিস কাছেই। একটা মোড় আর একটা রেলক্রসিং পেরিয়ে হেঁটে যেতে মিনিট দশেকের মতো সময় লাগে ... আজ রাতে ঘুম আসছিল না তার। বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল সে। রাত যতই বাড়ছিল একটা ভয় ততই তাকে গ্রাস করছিল । আর পিছল এক অনুভূতি টের পাচ্ছিল সে । আজ রাতেও কি তার মুখের ওপর ঝুঁকে কেউ চেয়ে থাকবে? সেই পারফিউমের হালকা গন্ধ পাবে? শুনতে পাবে চুড়ির রিনরিন শব্দ? অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি। জানালায় পর্দাটর্দা টাঙ্গানো হয়নি। জানালা গলে জোছনার সাদা আলো এসে পড়েছিল তার চোখেমুখে। ঘুমে চোখ একবার লেগে এসেছিল। ঠিক তখনই যেন পাশের ঘরে চুড়ির রিনরিন আওয়াজ শুনতে পেল। তার শরীরজুড়ে শিরশিরে এক অনুভূতি ছড়িয়ে যায়। তবে আজ ভয়ের বদলে রাগ হল তার। । বিছানা ছেড়ে উঠে অন্ধকারেই পাশের ঘরে ঢুকে আলো জ্বালাল। কেউ নেই। আমারই মনের ভুল? ভীষণ রাগ হচ্ছিল তার। ঘড়ি দেখল সে। প্রায় একটা বাজে । আজ আর ঘুম আসবে না। ফতুয়া গায়ে দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে নীচে নেমে এল সে ।কালই অফিসে বলবে বাড়ি বদলে দিতে । রাতের বেলা নির্জন বাড়িতে থাকতে নার্ভের ওপর চাপ পড়ছে। মেইন গেটের সামনে এসে সিগারেট ধরালো সে। চারধার নিঝঝুম হয়ে আছে। আকাশভরা জোছনার আলোয় ফাঁকা নির্জন রাস্তার অনেক দূর চোখে পড়ে । দূরে রেললাইনের দিক থেকে কুকুর ডাকছিল। ল্যাম্পপোস্টের আলোতেও জায়গাটা উজ্জ্বল। বাতাসে হাসনাহেনার গন্ধ। ভয়টা কিছুটা কমল। একবার দোতলার দিকে তাকাল সে । বারান্দায় গ্রিল নেই। পুরনো দিনের বাড়ি বলেই । এই মুহূর্তে দোতলার বারান্দার অন্ধকারে জোনাক পোকা জ্বলছে, নিভছে। এখন ওই বাড়িতে ঢোকার কথা ভাবতেই গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে উঠছে ... গতমাসে সে যখন এই ছোট্ট মফঃস্বল শহরটায় বদলী হয়ে এল, অফিস থেকেই তখন এই বাড়িটা তাকে ঠিক
করে দেওয়া হয়েছিল। দোতলা দালানটি বেশ পুরনো । এককালে হলদে রং ছিল। এখন বৃষ্টিবাদলে দেয়ালে ছাতা ধরে গেছে। একতলায় কোন্ এক অষুধ কোম্পানীর গুদাম। কার্নিসে ‘রিকো ফার্মা’ নামে কালো রঙের একটা সাইনবোর্ড টাঙানো। মাসখানেক প্রায় হয়ে এল এ বাড়িতে আছে সে । এর মধ্যে অষুধ কোম্পানীর কাউকে দেখেনি। একতলার বারান্দাটি গ্রিল দিয়ে ঘেরা। ডান পাশে একটা কালো রঙের কালেপসআবল গেট। গেটটা সব সময় বন্ধ দেখেছে সে । বাঁ পাশে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। বাড়ি ঘিরে শ্যাওলা ধরা দেয়াল। দেয়াল ঘেঁষে নাড়কেল গাছের সারি । মর্চে ধরা কালো রঙের মেইন গেটটাও পুরনো। সারাক্ষণ খোলাই থাকে। বাড়ির সামনে পিচ রাস্তা। বাড়ির ঠিক উলটো দিকে পিচ রাস্তা ঘেঁষে একটা পানা পুকুর। তারপর ফাঁকা মাঠ। ও মাঠে ধোপারা কাপড় শুকাতে দেয়। মাঠের পরে একটা স্কুলের পিছন দিকের দেয়াল। সব মিলিয়ে এ জায়গাটা ভারি নির্জন। আজকাল মফঃস্বল শহর হলেও এরকম নির্জন স্থান বিরল। ... সিগারেট টানতে- টানতে নিজের সঙ্গে তর্ক করে সে । এসবই আমার মনের ভুল? আমি একটা নির্জন বাড়িতে একা আছি বলে আমার মনে এরকম ভয়ের অনুভূতি হয়? ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে সিগারেট টানে। এক ধরণের অস্বস্তি ঘিরে থাকে তাকে। টুংটাং শব্দে খানিকটা চমকে ফিরে তাকায় সে। একটা রিকশা এসে গেটের সামনে থেমেছে । সে খানিকটা অবাক হল। এত রাতে কারা এল? সিগারেট ছুড়ে ফেলে দিল সে। একজন মাঝবয়েসি ভদ্রলোক রিকশা থেকে নামলেন। ভদ্রলোকের পরনে সাদা রঙের ফতুয়া, কালো রঙের প্যান্ট। গায়ের রং কালো। মাথার সামনের দিকে টাক। মুখে দাড়ি। রিকশায় একজন মহিলা বসে আছেন । ভদ্রমহিলার কোলে ছ- সাত বছরের ছোট একটি মেয়ে। বেশ মায়াবী আর টলটলে দেখতে। মেয়েটির মাথায় বাচ্চাদের সাদা রঙের শোলার হ্যাট। ভদ্রলোক ভাড়া মেটালেন। তারপর ছোট মেয়েটিকে কোলে তুলে নীচে নামিয়ে নিলেন । মহিলা ধীরেসুস্থে রিকশা থেকে নেমে এলেন।
তিরিশ- পঁয়ত্রিশের মতো বয়স হবে মহিলার। পরনে শাদা রঙের শাড়ি। কালো ব্লাউজ। রিকশা টুংটাং শব্দ তুলে চলে যায়। মহিলা তার দিকে তাকালেন। তারপর এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তো এ বাড়িতেই থাকেন, না? বলে মহিলা আঁচল ঠিক করলেন। চুড়ির রিনরিন শব্দ হল। হ্যাঁ। সে বলে। পারফিউমের পরিচিত মৃদু গন্ধ পেল সে। আশ্চর্য! মহিলা এবার জিজ্ঞেস করলেন, দোতলায় তো আফসানার থাকে, না? সে ভীষণ চমকে ওঠে। বলে, না তো ... রুনু খালা! দোতলা থেকে ছোট মেয়ের কন্ঠস্বর শুনে সে চমকে ওঠে। ঘুরে দোতলার বারান্দার দিকে তাকিয়ে জমে গেল সে। বারান্দায় উজ্জ্বল আলো জ্বলে আছে। রেলিংয়ে ছ-সাত বছরের ছোট একটি মেয়ে ঝুঁকে আছে। বেশ মায়াবী আর টলটলে দেখতে। মাথায় বাচ্চাদের সাদা রঙের শোলার হ্যাট। বাচ্চাটি তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে। আশ্চর্য! কে ওই মেয়েটি ? টের পায় সে-তার কন্ঠনালী শুকিয়ে গেছে। ভদ্রমহিলা উঁচু গলায় বললেন, তোর মা আছে রে আফসানা? হ্যাঁ। এই তো মা। ছোট মেয়েটির পাশে এসে একজন মহিলা দাঁড়িয়েছেন। মহিলার বয়স তিরিশ- পঁয়ত্রিশ বছর হবে। পরনে শাদা শাড়ি। বাতাসে আঁচল উড়ছিল বলেই কালো ব্লাউজটা চোখে পড়ল। মহিলা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে প্রবল শীত টের পায়। মহিলার পাশে একজন ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন । মাঝবয়েসি। গায়ের রং কালো। পরনে সাদা রঙের ফতুয়া। মাথার সামনের দিকে অনেকখানি টাক। মুখে দাড়ি। কারা ওরা? আতঙ্কে হিম হয়ে যেতে থাকে সে। ভদ্রমহিলা ছোট মেয়েটিকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর ‌'চলো' বলে হাঁটতে থাকেন। ভদ্রলোক ওদের পিছন পিছন যেতে থাকেন । ওপরে দরজা খোলার শব্দ হয় । তারপর সিঁড়িতে আলো জ্বলে ওঠে। কারা যেন কথা বলছে। ওরা সিঁড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ছোট মেয়েটি পিছন ফিরে তার দিকে চেয়ে আছে। ভেজা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে সে । তার পা দুটো ভীষণ ভারী ঠেকছে। মাথার ভিতরে কুয়াশা। মাথার তালু ভিজে যাচ্ছে ঘামে। শরীরজুড়ে হিমস্রোত টের পায়। কারা ওরা? এক অদম্য কৌতূহল আর বিস্ময় তাকে সিঁড়ির কাছে পৌঁছে দেয় ... যেন কেউ তাকে ইশারায় ডাকছিল ... তারপর ঘোরের মধ্যে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে- উঠতে পারফিউমের মৃদু গন্ধ পেল সে ...

কালো যাদু

‘সব কাজ সবার দ্বারা সম্ভব না।’, তীব্র আপত্তির সুরে বললেন আহসান সাহেব। আহসান সাহেব তপুর বড় চাচা। রাজশাহী শহরের একজন শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। রাজশাহী কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি পড়াশুনা করেছেন কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে রীতিমত গবেষণা করেছেন আর সে বিষয়টা হল ব্লাক ম্যাজিক বা কালো যাদু। ব্লাক ম্যাজিকের উপর তিনি প্রচুর পড়াশুনা করেছেন, রাতের পর রাত কাটিয়েছেন শ্মশানঘাট আর কবরস্থানে। এমনকি হাতে কলমে ব্লাক ম্যাজিক শেখার জন্য তিনি বেশ কিছুদিন কাটিয়ে এসেছেন আফ্রিকায়, শিখেছেন সেখানকার ভয়ংকর সব কালো বিদ্যা, যার আফ্রিকান স্থানীয় নাম হল ভূডু। তপু আহসান সাহেবের ছোট ভাইয়ের ছেলে। রাজশাহী কলেজের ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। প্রচণ্ড ভালবাসেন তিনি তপুকে। তপুর প্রত্যেকটা আব্দার তিনি পূরণ করেন, কোন কিছুতেই না করেন না। কিন্তু যখন তপু বলল, সে ব্লাক ম্যাজিক শিখতে চায়, তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, তপুর পক্ষে এটা সম্ভব নয়। ‘কেন সম্ভব না, তুমি পারলে আমি কেন পারব না?’, বলল তপু। ‘দেখ তপু, ব্লাক ম্যাজিক ছেলেখেলা না, পদে পদে এখানে বিপদের আশঙ্কা থাকে।’ ‘থাকুক, তবুও আমি শিখব।’ একগুঁয়ের মত জবাব দিল তপু। ‘আমি তোকে শিখাবো না’ বড় চাচাও কম যাননা। ‘চাচা প্লিজ, আমি ঠিক পারব। দেখো কোন বিপদ হবে না।’ ‘তপু, তোকে আমি খুব ভালোভাবে চিনি, তোর দ্বারা এসব সম্ভব না। প্রচণ্ড সাহস লাগে এতে। সাহস না থাকলে ব্লাক ম্যাজিকের প্রথম স্তরটাই পার হওয়া যায় না।’ ‘কিন্তু আমি পারব। সাহস আমিও কম রাখিনা।’ তীব্র জেদের সাথে উত্তর দিল তপু। ‘হ্যা, জানি তোর সাহস কতদূর। কদিন আগেও তো নিজের ছায়া দেখে ভয় পাতিস।’ ‘সে তো বহুদিন আগের কথা, তখন তো আমি এক্কেবারে ছোট ছিলাম। ওসব কথা বাদ দাওতো, তুমি শিখাবে কিনা বলো।’ ‘ না’ এক কথায় উত্তর দেন আহসান সাহেব। ‘চাচা প্লিজ, খালি একটা সুযোগ দাও। দেখো, আমি ঠিক পারব। যদি না পারি, তাহলে আর কখনও তোমাকে জ্বালাবো না। শুধু একটা সুযোগ দাও।’ অনুনয় ঝরে পরল তপুর কন্ঠ থেকে।
‘ কিন্তু .......’ ‘প্লিজ চাচা, প্লিজ’ কিছুক্ষণ চুপ করে কি যেন ভাবলেন আহসান সাহেব। ‘ঠিক আছে, কিন্তু মনে রাখিস একটাই মাত্র সুযোগ পাবি তুই। একটা ছোট পরীক্ষা হবে, যদি উত্তীর্ণ না হতে পারিস তাহলে আর কখনও ব্লাক ম্যাজিকের নাম মুখেও আনতে পারবিনা, ঠিক আছে?’ বললেন আহসান সাহেব। ‘রাজি,’ আনন্দে সব কটা দাঁত বের করে হাসল তপু। ‘আজ পঁচিশ তারিখ। পরশুদিন অর্থাৎ সাতাশ তারিখ অমাবস্যার রাত। পরশুদিন ঠিক রাত বারটার সময় একটা মাটির হাড়ি, এক সের আতপ চাল আর বিশটা দাঁতন নিয়ে কাদেরগঞ্জ কবরস্থানের ভিতরে ঢুকে যাবি। সোজা কিছুক্ষণ চলার পর অনেক পুরনো একটা বটগাছ দেখতে পাবি। বটগাছটার ডান পাশ দিয়ে একটা ছোট রাস্তা চলে গেছে। সেই রাস্তা দিয়ে একেবারে সোজা চলে যাবি। সেই রাস্তার একেবারে শেষ মাথায় দেখবি অনেক পুরনো একটা ভাঙ্গা কবর আছে। কবরটার পাশে একখণ্ড ফাঁকা মাঠ আছে। ঐ মাঠের মাঝখানে ছোট একটা চুলা খুঁড়বি, তারপর দাঁতন দিয়ে চুলাটায় আগুন ধরিয়ে হাঁড়িতে চাল আর পানি দিয়ে ভাত চড়িয়ে দিবি। চাল ফুটে ভাত না হওয়া পর্যন্ত একটা করে দাঁতন দিয়ে চুলায় জ্বাল দিতে থাকবি। ভাত হয়ে গেলে হাঁড়িশুদ্ধ ভাত নিয়ে সোজা আমার কাছে চলে আসবি। যদি এই কাজটা করতে পারিস তাহলে আমি আর কোন বাঁধা দেবনা, পরশু থেকেই তোর ব্লাক ম্যাজিকের দীক্ষা শুরু হবে।’ বললেন আহসান সাহেব। ‘ব্যাস এইটুকুই?’, একটু অবাকই হল তপু, ‘আমি তো ভেবেছিলাম খুব কঠিন কোন পরীক্ষা হবে। ঠিক আছে চাচা, ভেবে নাও আমি পরীক্ষায় পাশ করে গেছি।’ ‘একটা ব্যাপারে তোকে সাবধান করে দেই তপু, ভাত রান্না করার সময় হয়তো আশেপাশে অনেক রকম শব্দ শুনতে পাবি, হয়তো শুনবি কেউ তোর নাম ধরে ডাকছে কিংবা কেউ হয়তো সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে, খবরদার সেই ডাকে সাড়া দিবিনা, খবরদার। আসলে আমি নিজেও জানিনা ওখানে কি ঘটবে, শুধু বলে রাখছি, সবসময় সাবধান থাকবি’ সাবধান করলেন আহসান সাহেব। চাচার দিকে তাকিয়ে থাকল তপু। ঠিক বুঝতে পারল না, চাচা তাকে ভয় দেখাচ্ছে না সত্যিই সাবধান করছে তবে যাই হোক না কেন সে ভয় পাবে না, এই পরীক্ষায় তাকে পাশ করতেই হবে। সাতাশ তারিখ রাত পৌনে এগারটা বাজতে না বাজতেই তপু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে কাদেরগঞ্জ কবরস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। তপুদের বাসা থেকে কাদেরগঞ্জ কবরস্থানে রিকশায় যেতে সময় লাগে প্রায় এক ঘন্টা। ঠিক
পৌনে বারোটায় তপু কবরস্থানের গেটে পৌঁছে গেল। এতক্ষণ প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস থাকলেও, কবরস্থানের ভয়াবহ নিস্তব্ধতা তপুর আত্মবিশ্বাসকে অনেকটা দমিয়ে দিল। দুরুদুরু বুকে কবরস্থানের গেটে আস্তে ধাক্কা দিল তপু। প্রায় নিঃশব্দেই খুলে গেল গেটটা। কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা সামনের দিকে হাটা দিল তপু। চাচার নির্দেশমতো কিছুক্ষণ চলার পরে অবশেষে ভাঙা কবরটার পাশের ফাঁকা মাঠটা খুঁজে পেল। মাঠটার মাঝখানে ছোট্ট একটা চুলা খুঁড়ল। এরপর চারটা দাঁতন একসঙ্গে ধরিয়ে চুলায় আগুন জ্বালাল। হাঁড়িতে চাল আর পানি দিয়ে চুলার উপর চড়িয়ে দিল। এরপর একটা একটা করে চুলায় দাঁতন দিতে থাকল তপু। সময় যেন খুব ধীরে কাটতে লাগল। তেরটা দাঁতন শেষ, ভাত ফুটতে আর খুব বেশি দেরি নাই। কোথায় যেন একটা কুকুর ডেকে উঠল। অকারণেই শরীরটা একটু ছমছম করে উঠল তপুর। হঠাৎ খেয়াল করল, ওর থেকে বড়জোর সাত- আট হাত দূরে একজন মহিলা বসে একটা চুলা খুঁড়ছে। কোলে একটা বাচচা। ঘোমটা দিয়ে ঢেকে রাখার কারণে মহিলার চেহারা দেখতে পারলনা তপু। অবাক হয়ে তপু দেখল, ওই মহিলাটাও ঠিক তারই মত করে দাঁতন দিয়ে চুলা জ্বালিয়ে ভাত রাঁধতে লাগল। আশ্চর্য, পাশে যে একজন লোক বসে আছে তা যেন মহিলাটা দেখেইনি। আপন মনে একটা একটা দাঁতন দিয়ে চুলায় জ্বাল দিতে থাকল। তপু ঠিক বুঝতে পারেনা, ওই মহিলাও কি তপুর মত কালো যাদু শিখতে চায়? কেন? নিজের কাজ ফেলে সম্মোহনী দৃষ্টিতে মহিলার কাজ দেখতে থাকে তপু। দেখতে দেখতে মহিলার দাঁতন শেষ হয়ে আসল। চুলার চারদিকে হাত বুলাল কিন্তু জ্বালানোর মত আর কিছু না পেয়ে শেষে নিজের কোল থেকে বাচচাটাকে তুলে নিয়ে চুলার ভিতরে ছুড়ে মারল। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছেনা তপু। আর একটু হলেই চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল এই নৃশংস দৃশ্য দেখে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে নিল। ওদিকে মহিলার চুলার আগুন আবার প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আবার মহিলাটা চুলার চারপাশে জ্বালানীর জন্য হাত বুলাল, কিন্তু কিছুই পেল না। হঠাৎ মহিলাটা খ্যাঁনখ্যাঁনে গলায় বলে উঠল, “ দাঁতন পুড়ে শেষ হল, ভাত ফুটল না। নিজের বাচচাটাকে পুড়িয়ে ফেললাম, তাও ভাত হলনা। এইবার ওই মিনসেটাকে পুড়িয়ে ভাত ফোটাবো,” বলে একটানে নিজের ঘোমটাটা খুলে ফেলে তপুর দিকে ঘুরে তাকাল। মহিলাটা তপুর দিকে তাকাতেই ভয়ের একটা শীতল শিহরন বয়ে গেল তপুর শরীর বেয়ে। কোথায় মহিলা, একটা পিশাচীনি ভয়ংকর চোখে তাকিয়ে আছে তপুর দিকে। মুখ থেকে মাংস পচে গলে পড়ছে, চোখের জায়গায় দুটো শুন্য কোটর ভয়ংকর ভাবে তাকিয়ে আছে তপুর দিকে। আবার খ্যাঁনখ্যাঁনে কন্ঠে বলে উঠল পিশাচীটা, “ আয়, আমার কাছে আয়। আয় মিনসে, আজ তোকে দিয়েই আমার সাধনা শেষ করব।” বলে শাড়ির ভিতর থেকে একটা লোমশ কুৎসিত হাত বের করে তপুর দিকে বাড়িয়ে দিল পিশাচীটা। পরদিন। কাদেরগঞ্জ কবরস্থানের গেটের ঠিক সামনে এসে একটা গাড়ি থামল। গাড়ির দরজা খুলে আহসান সাহেব বের হয়ে আসলেন। কবরস্থানের গেট খুলে সোজা পথ ধরে হেঁটে গেলেন। বটগাছটার সামনে যেতেই দেখতে পেলেন অচেতন তপুকে। একটু হাসলেন তিনি। তপুকে ঘাড়ে করে তুলে নিয়ে গাড়ির পিছনের সিটে শুইয়ে দিলেন তারপর গাড়ি ছুটালেন সোজা বাড়ির দিকে। ‘সব কাজ সবার দ্বারা সম্ভব না।’, বিড়বিড় করে বলে উঠলেন তিনি।
bhooterblog.tk. Powered by Blogger.

Test Footer 2

Subscribe to our newsletter

×
Chat